বৃহস্পতিবার, জুন ১৮, ২০২৬

বিআরটিএ নেত্রকোনায় নথিহীন ২৪০ ভারী যানবাহনের নিবন্ধনের অ’ভিযোগ

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নেত্রকোনা কার্যালয়ে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২৪০টি ভারী যানবাহনের নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) প্রদানকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রয়োজনীয় আমদানি নথি, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, ইনভয়েস কিংবা ব্যাংক চালানের কপি ছাড়াই এসব যানবাহনের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যানবাহনগুলোর মূল ফাইল ও নথিপত্র কার্যালয়ে সংরক্ষিত নেই বলেও দাবি করা হচ্ছে।

বিআরটিএর একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, ওই সময় নেত্রকোনা কার্যালয়ের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন সহকারী পরিচালক (এডি), পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে ডেপুটি ডিরেক্টর (ডিডি) হিসেবে অবসর গ্রহণকারী শহীদুল আজমের দায়িত্বকালেই এসব নিবন্ধন সম্পন্ন হয়। অভিযোগকারীদের মতে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাগজপত্রবিহীন ভারী যানবাহন নিবন্ধন দিয়ে বিপুল অঙ্কের ঘুষ বাণিজ্য পরিচালিত হয়েছিল।

দুই বছরে ২৪০ যানবাহন, নেই মূল ফাইল

অভিযোগ অনুযায়ী, নেত্রকোনার আঞ্চলিক কোড ব্যবহার করে নিবন্ধন দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ২৪০টি যানবাহনের কোনো মূল ফাইল, নথিপত্র বা ব্যাংক চালানের কপি বর্তমানে কার্যালয়ে পাওয়া যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ঘুষের বিনিময়ে ব্যাক-ডেটে ডিজিটাল সিস্টেমে তথ্য এন্ট্রি করে পরবর্তীতে ফাইলগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি যানবাহনের বিপরীতে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হয়েছিল।

২০ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে দুই বছরের নিবন্ধন

বিআরটিএর ডিজিটাল ডেটাবেস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছরে নেত্রকোনা কার্যালয় থেকে মোট ২৮টি ভারী যানবাহনের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল। অথচ ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী মাত্র দুই বছরে নিবন্ধিত হয় ২৪০টি ভারী যানবাহন।

তুলনামূলক পরিসংখ্যান অনুযায়ী—

  • ভারী ট্রাক: ২০ বছরে ১০টি, দুই বছরে ৪৯টি
  • মিনি ট্রাক: ২০ বছরে ৫টি, দুই বছরে ৭৮টি
  • পিকআপ: ২০ বছরে ৬টি, দুই বছরে ৮৪টি
  • ট্যাংক লরি: ২০ বছরে ৪টি, দুই বছরে ২১টি
  • মাইক্রোবাস ও স্পেশাল যান: ২০ বছরে ৩টি, দুই বছরে ৯টি

এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

নেত্রকোনার নিবন্ধন, মালিক অন্য জেলার

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নিবন্ধনপ্রাপ্ত ২৪০টি যানবাহনের মালিকদের অধিকাংশই নেত্রকোনার বাসিন্দা নন। তাদের ঠিকানা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও যশোরসহ বিভিন্ন জেলার।

নথি অনুযায়ী, কয়েকটি যানবাহনের মালিকের ঠিকানা চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, সীতাকুণ্ড এবং যশোরের বারীনগর এলাকায় উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে স্থানীয় নিবন্ধন কোড ব্যবহার করে দূরবর্তী জেলার মালিকদের নামে নিবন্ধন দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বাধ্যতামূলক নথিপত্রের অনুপস্থিতি

নিয়ম অনুযায়ী ভারী যানবাহন নিবন্ধনের জন্য ইনভয়েস, বিল অব এন্ট্রি, বিল অব লেডিং, কমার্শিয়াল ইনভয়েস, এলসিএ, প্যাকিং লিস্ট, টিআইএন সনদ, এইচ-ফরম এবং ব্যাংক চালানের কপিসহ একাধিক নথি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

তবে অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ২৪০টি যানবাহনের কোনো ফাইল বর্তমানে নেত্রকোনা কার্যালয়ে সংরক্ষিত নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএর কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সে সময় ময়মনসিংহে অবস্থান করেই নেত্রকোনার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হতো এবং কাগজপত্র ছাড়াই বিভিন্ন তথ্য ডিজিটাল সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

তদন্তের দাবি

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম ও ট্রাকচালক কলিম উদ্দিন বলেন, “বিআরটিএতে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না—এমন অভিযোগ অনেকদিনের। কিন্তু কোনো ফাইল বা সরকারি কাগজপত্র ছাড়া ভারী যানবাহনের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিষয়টি দুদকের মাধ্যমে তদন্ত হওয়া উচিত।”

নেত্রকোনা জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি বেগম রোকেয়া বলেন, “কোনো নথি বা ফাইল ছাড়া এভাবে বিপুলসংখ্যক ভারী যানবাহনের নিবন্ধন দেওয়ার অভিযোগ পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।”

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ