মঙ্গলবার, জুন ১৬, ২০২৬

চিলমারী নদীবন্দর প্রকল্পে ৩৩৫ কোটি টাকার কাজে অ’নিয়মের অ’ভিযোগ

কুড়িগ্রামের চিলমারী নদীবন্দর স্থাপন প্রকল্পকে ঘিরে অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি, নিম্নমানের নির্মাণকাজ এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার একাধিক অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৩৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) এই প্রকল্পে সরকারি অর্থ অপচয় ও অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা, স্থানীয় সূত্র এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি।

সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, চিলমারী নদীবন্দর প্রকল্পের মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ছিল প্রায় ২৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। পরে সংশোধিত ডিপিপিতে ব্যয় বেড়ে প্রায় ৩৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বাস্তবায়ন পর্যায়েও বিভিন্ন অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।

বর্তমানে প্রকল্পটির পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ মোল্লা। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে কয়েকজন ঠিকাদার, সাব-কন্ট্রাক্টর এবং প্রভাবশালী ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল, যারা প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ ও বিল অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছে।

সাইট ডেভেলপমেন্টে অনিয়মের অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, প্রকল্পের সাইট ডেভেলপমেন্ট কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বালু ভরাট ও ভূমি উন্নয়ন সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এ খাতে কয়েক কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হলেও বাস্তব কাজের সঙ্গে কাগজপত্রের উল্লেখযোগ্য অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু কাজ নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে অন্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রকল্পের আর্থিক ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেছে।

ভবন নির্মাণে নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ

প্রকল্প এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা ও প্রকৌশলগত মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, কিছু ভবনের পাইলিং ও ভিত্তি নির্মাণে ত্রুটি থাকায় ভবিষ্যতে স্থাপনার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বতন্ত্র কারিগরি নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। স্থানীয়দের দাবি, জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়ম, জালিয়াতি এবং অসঙ্গতি ঘটেছে। তারা এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

ঠিকাদারি ও বিল পরিশোধে প্রশ্ন

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের কিছু কাজের ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে এক প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেও অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে অন্য প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। এ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট কিছু নথিতে বিভিন্ন পেমেন্ট সার্টিফিকেট ও বিল অনুমোদনের তথ্য থাকলেও সেগুলোর বৈধতা এবং প্রকৃত কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পাইলিং কাজে অনিয়মের অভিযোগ

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের পাইলিং কাজে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্ধারিত ব্যাস, গভীরতা ও রড ব্যবহারের পরিবর্তে কম পরিমাণ উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, প্রকল্প এলাকায় কার্যাদেশে নির্ধারিত স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে বাস্তব নির্মাণকাজের পার্থক্য রয়েছে। এর ফলে নির্মাণমান ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।

কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষের অভিযোগ

বিআইডব্লিউটিএর কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, প্রকল্পের টেন্ডার ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে সে সময় প্রভাবশালী মহলের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ