
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় ‘খাল খনন ও সংস্কার’ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী তালিকাভুক্ত শ্রমিকের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বাস্তবে শ্রমিক ছাড়াই এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন ব্যবহার করে দ্রুতগতিতে কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থ লেনদেন ও তদারকিতে উপজেলা বিআরডিবি অফিসের এক নাইট গার্ডের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারা দেশে খাল খনন, পুনঃখনন ও সংস্কারের জন্য ৪২০ কোটি ৮৮ লাখ টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ৬৩ জেলার ২৪৯টি উপজেলায় ৩৭৬টি খাল সংস্কার প্রকল্প অনুমোদন পায়। গাইবান্ধা জেলার সাত উপজেলায় মোট ১৩টি খাল সংস্কার প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ১৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
এর মধ্যে সাঘাটা উপজেলার পদুমশহর ইউনিয়নের দাতিয়া খাল খনন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ লাখ ৭৯ হাজার ১৪৭ টাকা এবং কামালেরপাড়া ইউনিয়নের কৈচড়া খাল সংস্কার প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৩ লাখ ২১ হাজার ৬৬৩ টাকা।
কাগজে ৫৯ শ্রমিক, মাঠে ভেকু মেশিন
সরেজমিনে পদুমশহর ইউনিয়নের দাতিয়া খাল খনন প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে দুটি এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে পুরোদমে খননকাজ চলছে। অথচ প্রকল্প নথি অনুযায়ী এ কাজে ৫৯ জন শ্রমিক নিয়োজিত থাকার কথা।
স্থানীয় সূত্র বলছে, প্রকল্পের কাজ শুরুর পাঁচ দিনের মধ্যেই প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প এলাকায় হাতে গোনা কয়েকজন শ্রমিক ছাড়া কোনো শ্রমিক বাহিনী দেখা যায়নি।
ভেকু মেশিনের চালক নজরুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা চুক্তিতে তারা কাজ করছেন। গত পাঁচ দিনে প্রায় ৩০০ মিটার খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং এ বাবদ প্রায় ২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তার দাবি, ‘জাহিদ’ নামে একজন ব্যক্তি তাদের পারিশ্রমিক পরিশোধ করছেন।
তদারকিতে পিআইও নন, বিআরডিবির নাইট গার্ড!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পের অর্থ লেনদেন ও মাঠপর্যায়ের তদারকির সঙ্গে জড়িত জাহিদ নামে যাকে দেখা যাচ্ছে, তিনি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন। তিনি উপজেলা বিআরডিবি অফিসে নাইট গার্ড হিসেবে কর্মরত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি দায়িত্বে না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেখভাল করছেন।
প্রকল্প এলাকায় কর্মরত শ্রমিক মুন্না মিয়া ও মাহাবুর রহমান বলেন, “আমরা তিনজন এখানে কাজ করি। জাহিদ আমাদের দৈনিক ৮০০ টাকা করে দেন। সরকারি তালিকাভুক্ত কোনো শ্রমিক এখানে কাজ করছেন না।”
অভিযোগের বিষয়ে জাহিদ বলেন, “আমি কোনো কর্মকর্তা নই। টাকা-পয়সা দেওয়ার দায়িত্বও আমার না। স্যার (পিআইও) যা করতে বলেন, আমি শুধু সেটাই করি।”
প্রকল্প কমিটির সদস্যদের মধ্যেও অসন্তোষ
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য ও স্থানীয় জামায়াতের আমির রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি কমিটির সদস্য হয়েও কাজ শুরুর বিষয়ে কিছু জানি না। আমাকে না জানিয়েই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য মৌসুমি বেগম বলেন, “আমি শ্রমিকদের তালিকা দিয়েছি। ব্যাংক হিসাব খোলার কিছু জটিলতা রয়েছে বলে জানি। তবে ভেকু দিয়ে কাজ করানোর বিষয়টি আমার জানা ছিল না।”
অন্যদিকে প্রকল্পের সদস্য সচিব ও ইউপি সদস্য রোসার আলী ভেকু ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “শ্রমিকদের তালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তাই আপাতত ভেকু দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। তালিকা সম্পন্ন হলে শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হবে।”
চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের বক্তব্য
প্রকল্পের সভাপতি ও পদুমশহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মফিজুল হক বলেন, “শ্রমিক তালিকা প্রায় প্রস্তুত। দু-এক দিনের মধ্যেই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে।” তবে ভেকু মেশিন দিয়ে খননকাজ পরিচালনার বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে দাবি করেন।
সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মেহেদী হাসান বলেন, “প্রাথমিকভাবে খালের তলদেশ সমান করার জন্য ভেকু ব্যবহার করা হচ্ছে। শ্রমিকদের তালিকা এখনও সম্পন্ন হয়নি। পরে শ্রমিকদের মাধ্যমে ফিনিশিং কাজ করা হবে।”
বিআরডিবির নাইট গার্ড জাহিদের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য না করে পরে সাক্ষাতে কথা বলবেন বলে জানান।
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল কবির বলেন, “প্রকল্পটি পিআইও অফিস ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সেখানে অনিয়ম হওয়ার কথা নয়। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রশ্নের মুখে প্রকল্প বাস্তবায়ন
সরকারি প্রকল্পে শ্রমিক নিয়োগের পরিবর্তে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যদের অজ্ঞাতসারে কাজ শুরু এবং সরকারি দপ্তরের বাইরে একজন কর্মচারীর তদারকির অভিযোগ স্থানীয়ভাবে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এখন সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।

