
সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’কে ঘিরে নতুন করে অনিয়ম, পক্ষপাতমূলক বরাদ্দ এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৮ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের আগেই নতুন দরপত্র আহ্বান করাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রকল্পটির আওতায় আর্সেনিক ও আয়রন রিমুভাল ফিল্টার স্থাপন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ, প্যাকেজ বিভাজন এবং কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
ডিপিপি অনুমোদনের আগেই টেন্ডার
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের গ্রামীণ ও পৌর এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২০ সালের ৭ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী সারা দেশে প্রায় ২৯ হাজার ৫৭০টি আর্সেনিক ও আয়রন রিমুভাল ফিল্টার স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। তবে সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের আগেই গত মার্চ মাসে কক্সবাজার জেলায় ৪ হাজার ফিল্টার স্থাপনের জন্য নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়, যা গত ৫ এপ্রিল খোলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানই কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বরাদ্দ বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, যেসব এলাকায় আর্সেনিক দূষণের সমস্যা প্রকট, সেসব এলাকায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে কয়েকটি নির্দিষ্ট জেলায় তুলনামূলক বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তাদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রয়োজনের পরিবর্তে প্রভাব ও পছন্দের ভিত্তিতে বরাদ্দ বণ্টন করা হলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, ফিল্টার স্থাপন সংক্রান্ত কাজগুলোতে বড় অঙ্কের কমিশন লেনদেনের প্রচলন রয়েছে। তারা দাবি করেন, বিভিন্ন পর্যায়ে নির্ধারিত হারে কমিশন ছাড়া কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
কুমিল্লা ও কক্সবাজারের প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনের আগে কুমিল্লায় থাকাকালীন সময়েও কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন ও টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে প্রকল্প ব্যয় ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো হয়েছিল।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের আগে প্রথম সংশোধনীর বাইরে অতিরিক্ত কাজের জন্য নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলে তা বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটি পর্যালোচনার বিষয়।
অন্যদিকে, কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন যে দরপত্রের শর্তাবলি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ে।
কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আউয়ালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অফিস সময়ের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার অনুরোধ জানান।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব শহিদুল হাসানের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনিও অফিস সময়ের মধ্যে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে অভিযোগসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
প্রকল্পের উপ-পরিচালক (ডিপিডি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান এবং কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাসরুল্লাহর সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং সুশাসনকর্মীদের মতে, প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া, বরাদ্দ বণ্টন এবং বাস্তবায়ন কার্যক্রম নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের মূল লক্ষ্যও বাস্তবায়িত হবে।

