শুক্রবার, মে ২৯, ২০২৬

জব্দ ব্যাংক হিসাব থেকে ১০০ কোটি টাকা উত্তোলনের অ’ভিযোগ, তোলপাড় ব্যাংক ও প্রশাসনিক মহলে

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নির্দেশনা উপেক্ষা করে জব্দ করা ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাংকিং খাত ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্পের আওতায় দুই দফায় মোট ৪৮ কোটি টাকা বিল বাবদ মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। প্রতিটি ধাপে ২৪ কোটি টাকা করে এই অর্থ ছাড় করা হয় বলে জানা গেছে।

তবে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে এর আগেই দুদক ও বিএফআইইউ মাসুদ আলম, তার স্ত্রী এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকিং খাতের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় ৩০ জুন ও ৩০ সেপ্টেম্বর ভিত্তিক বিলের টাকা কৌশলে উত্তোলন করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তোলিত অর্থের একটি অংশ সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং কারাগারে থাকা সাবেক সচিব মেজবাহ উদ্দিনের কাছে পাচার করা হয়েছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

একাধিক ধারায় মামলা

এ ঘটনায় সিআর মামলা নং-৪৯৯/২০২৫ দায়ের করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ৩২৬, ৩০৭, ১১৪ ও ১০৯ ধারাসহ বিশেষ ক্ষমতা আইনের বিভিন্ন ধারা যুক্ত করা হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি নির্দেশে জব্দ করা হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। তাদের মতে, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া থাকায় এমন ঘটনা ঘটানো সম্ভব হয়েছে।

ঘুষ ও প্রকল্প বাণিজ্যের অভিযোগ

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠে এসেছে যে, ৩০০ কোটি টাকার একটি সরকারি প্রকল্প পেতে বর্তমান যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টার তৎকালীন এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রায় ১০ কোটি টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছিল।

এছাড়া প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল হামিদ খানের বিরুদ্ধেও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব, ঘুষ ও উচ্চপর্যায়ের তদবিরের মাধ্যমে গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন

মাসুদ আলম একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। গত জুলাইয়ে সংঘটিত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তার বিরুদ্ধে উসকানি, হত্যা ও সরকারি সম্পদ ধ্বংসের অভিযোগে প্রায় ৭০টি মামলা দায়ের হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এমন গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নতুন সরকারের আমলেও তিনি প্রকল্প কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যা প্রশাসনের ভেতরেও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

‘প্রমিস গ্রুপ’ ও এমএলএম ব্যবসার অভিযোগ

ব্যবসায়িক অঙ্গনে মাসুদ আলম ‘প্রমিস গ্রুপ’-এর কর্ণধার হিসেবে পরিচিত। এর আগে ‘নগদহাট বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামে এমএলএম ব্যবসার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

পরবর্তীতে ‘প্রমিস মার্ট’, ‘প্রমিস অ্যাসেট’, ‘প্রমিস টেক’সহ অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে।

সম্পদের তথ্য নিয়ে ধোঁয়াশা

২০২৪ সালের এপ্রিলে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় জমা দেওয়া হলফনামায় মাসুদ আলম তার নিট সম্পদের পরিমাণ দেখান ৯ কোটি ৯৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা। সেখানে তার বার্ষিক আয় উল্লেখ করা হয় মাত্র ২১ লাখ টাকা।

তবে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, তার প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ ঘোষিত তথ্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদ গোপন রাখা হয়েছে।

বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা

ইতোমধ্যে দুদক মাসুদ আলম ও তার স্ত্রীর বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পাশাপাশি দেশের সব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে চিঠি পাঠিয়ে তাদের সম্পদের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

প্রমিস গ্রুপের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

কার্যক্রম স্থবির, ফোন বন্ধ

সরেজমিনে দেখা গেছে, ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের দাপ্তরিক ফোন নম্বরগুলো বন্ধ রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও অনেকটা স্থবির অবস্থায় আছে।

আইটি খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আগে থেকেই ভুয়া বিল-ভাউচার, নিম্নমানের প্রশিক্ষণ এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল। এরপরও বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানটিকে শতকোটি টাকার প্রকল্প দেওয়া এবং জব্দ হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়া রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।

তদন্তে কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত

দুদক ও বিএফআইইউ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কীভাবে জব্দ করা হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন করা হলো তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদও চলছে।

তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ