বুধবার, মে ১৩, ২০২৬

মাদারীপুর এলজিইডিতে পুকুর চু’রির অ’ভিযোগ, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীর বি’রুদ্ধে শতকোটি টাকার অ’নিয়মের দাবি

বহুল আলোচিত ‘বালিশ কেলেঙ্কারি’র পর এবার মাদারীপুর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) উঠেছে নতুন করে ‘পুকুর চুরি’র অভিযোগ। জেলার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বর্তমানে একটি বড় প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বাবুল আখতারের বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি, প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ে কার্যাদেশ প্রদান এবং সরকারের বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দৃষ্টি আকর্ষণ করে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়, বাবুল আখতার মাদারীপুরে দায়িত্ব পালনকালে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও আর্থিক কারসাজির মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিয়েছেন।

উচ্চ মূল্যে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, শিবচর উপজেলার আওতাধীন দরপত্র আইডি নং-৫৮৯৬৪৫ এর অধীনে আড়িয়াল খাঁ ব্রিজ থেকে বাবলাতলা বাজার এবং শিবচর সদর থেকে রাজৈর ভায়া উত্রাইল জিসি সড়ক উন্নয়ন কাজে ২৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার প্রাক্কলিত মূল্যের বিপরীতে ২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকায় কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এতে প্রায় ৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কাজটি মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, সাধারণত এ ধরনের প্রকল্পে প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় কম দরে কার্যাদেশ দেওয়া হলেও এখানে উল্টো অতিরিক্ত মূল্যে কাজ প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি সড়ক প্রশস্তকরণে পুরাতন রাস্তার ‘স্যালভেজ আইটেম’ বাবদ কোনো অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়।

একই প্রতিষ্ঠানের কাছে আরেকটি প্যাকেজে ২২ কোটি ৫৪ লাখ টাকার কাজ প্রায় ১০ শতাংশ বেশি মূল্যে দেওয়ার মাধ্যমে আরও প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেতু নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ

শিবচরের বিভিন্ন সড়কে অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় দরপত্র আইডি-৫৬০৫০৫ এর অধীনে ১৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকার একটি কাজেও প্রায় ১০ শতাংশ উচ্চ দরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এতে সরকারের প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া আরসিআইপি প্রকল্পের আওতায় সদর উপজেলায় প্রায় ২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্পে ‘ভুয়া প্রাক্কলন’ দেখিয়ে অনুমোদন নেওয়ার পর মেসার্স কহিনুর এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, করোনাকালীন লকডাউনের সুযোগে প্রকল্পটিতে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।

বিভিন্ন প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ

অনুসন্ধানে আরও কয়েকটি প্রকল্পে অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দরপত্রে ৪ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ দরে কার্যাদেশ প্রদান।

অভিযোগ অনুযায়ী—

  • দরপত্র আইডি ২৬২৯৭৫-এ মেসার্স পাভেল এন্টারপ্রাইজকে ৪.৯৩ শতাংশ বেশি দরে কাজ দেওয়া হয়।
  • দরপত্র আইডি ৩৩৮৩২৯-এ হাবিবা কনস্ট্রাকশনকে ৪.৯৫ শতাংশ উচ্চ দরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
  • দরপত্র আইডি ৩১৬০৬৯-এ মেসার্স মোহাম্মদ ফারুক মিয়াকে ৪.৯৭ শতাংশ বেশি দরে কাজ দেওয়া হয়।
  • দরপত্র আইডি ২৬২৯৭৬-এ মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনালকে ৪.৯৭ শতাংশ উচ্চ দরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
  • দরপত্র আইডি ৩৩৮৩৩০-এ মেসার্স আতাহার এন্টারপ্রাইজকে ৯.৪৯ শতাংশ বেশি মূল্যে কাজ দেওয়া হয়।
  • দরপত্র আইডি ৩৩৩২০০-এ মেসার্স মাদবর ট্রেডার্সকে ৯.৭২ শতাংশ উচ্চ দরে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়।

এছাড়াও আইডি নং ৩০১১৩৩, ২৯৫৯৩৬ এবং ২৬২৯৬৮-এর আওতায় বিভিন্ন এইচবিবি ও ড্রেনেজ প্রকল্পেও অতিরিক্ত মূল্যে কার্যাদেশ দিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ

অভিযোগকারীদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বাবুল আখতার একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশ করে ধারাবাহিকভাবে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কার্যাদেশ দিয়েছেন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, করোনাকালীন সময়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পে শতকোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে মাদারীপুরের সচেতন নাগরিকরা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন এবং দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

সংবাদ প্রকাশের স্বার্থে অভিযুক্ত বাবুল আখতারের বক্তব্য নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ