
নেই শুনানি, নেই মেয়রের অনুমোদন—শুধু কর্মকর্তার কলমের খোঁচায় কয়েক কোটি টাকার কর কমতে কমতে নেমে এসেছে কয়েক লাখ টাকায়। আর এভাবেই নিঃশব্দে উধাও হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। দীর্ঘদিন পর অবশেষে এই অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে সরকারি নিরীক্ষায়।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অডিট শাখার অনুসন্ধানে চসিকের রাজস্ব বিভাগের সাবেক দুই কর কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন ও রূপন কান্তি চৌধুরীর বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিধি লঙ্ঘন করে দুটি তিন তারকা হোটেল- আগ্রাবাদ হোটেল লিমিটেড ও সেন্ট মার্টিন হোটেল লিমিটেডকে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এতে চসিকের প্রায় ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, কর নির্ধারণ থেকে আপিল নিষ্পত্তি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হয়েছে। “সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্সেশন রুলস, ১৯৮৬”- এর ১১ ও ১২ ধারা অনুযায়ী আপিল রিভিউ বোর্ডের শুনানি এবং মেয়রের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হলেও তা মানা হয়নি।
৮ কোটির কর নামলো ৮৫ লাখে
নগরীর ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের গোসাইলডাঙ্গায় অবস্থিত আগ্রাবাদ হোটেল লিমিটেডের বার্ষিক গৃহকর প্রথমে ৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।
পরে ২০১৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আপিলের পর তৎকালীন কর কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন কোনো ধরনের বিধি অনুসরণ না করে তা কমিয়ে ৮৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করেন।
হোল্ডিং ট্যাক্স রেকর্ড, আপিল ফরম, প্রসিডিং, ফিল্ড বুক, অ্যাসেসমেন্ট লিস্ট ও ট্যাক্স লেজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাধ্যতামূলক রিভিউ কমিটির শুনানি ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে এক ধাক্কায় ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
ধাপে ধাপে কমানো হলো কর
একই ওয়ার্ডে অবস্থিত সেন্ট মার্টিন হোটেল লিমিটেডের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির গৃহকর প্রথমে ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হলেও আপিলের পর তা ২২ লাখ টাকায় নামানো হয়। পরবর্তীতে কোনো নোটিশ ছাড়াই দ্বিতীয়বার আপিল নিষ্পত্তি দেখিয়ে কর আরও কমিয়ে ১৮ লাখ টাকা করা হয়। এই প্রক্রিয়াতেও আপিল রিভিউ বোর্ড বা মেয়রের অনুমোদন ছিল না।
এতে প্রায় ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়, দুই ক্ষেত্রেই পরিকল্পিতভাবে কর কমিয়ে করদাতাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক অনিয়মের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে একদিকে চসিক বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো অবৈধ সুবিধা পাচ্ছে—যা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তদন্ত কমিটি গঠন
এ বিষয়ে চসিকের রাজস্ব বিভাগের অঞ্চল–৭ এর বর্তমান কর কর্মকর্তা এ.কে.এম. সালাহউদ্দিন জানান, আগ্রাবাদ ও সেন্ট মার্টিন হোটেলের গৃহকর কমানোর ঘটনায় আইন কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মুরাদকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে তদন্ত কমিটির অগ্রগতি বা সম্ভাব্য ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চসিকের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন ও আইন উপদেষ্টা মহিউদ্দিন মুরাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
@news247bangla

