
‘নতুন বাংলাদেশে, নতুন আঙ্গিকে বিপিএল’ টুর্নামেন্টটির একাদশ আসর মাঠে গড়ানোর আগে এমন প্রত্যাশার কথাই শুনিয়েছিল বিসিবি, যা বাস্তবায়ন করতে কোনো ধরনের কমতিও রাখেনি তারা। তবে সমস্যটা বাঁধে টিকিট নিয়ে, যা নিয়ে সমালোচনাও কম হয় না, চলছে এখনো। তবে সেসব ছাপিয়ে গেছে আসরটিতে লোকাল ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স। ব্যাটে-বলে-ফিল্ডিংয়ে সব জায়গায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে দেশের ক্রিকেটাররা। সেটিও আবার মিরপুরে যেখানে সচরাচর দেখা যায়, ব্যাটারদের অসহায়ত্ত ও বোলারদের রাজত্ব।
এবার ঢাকায় প্রথম পর্ব শেষে বিপিএলের খেলা মাঠে গড়াবে চায়ের দেশ সিলেটে। আগামীকাল এই পর্বের প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক সিলেট স্ট্রাইকার্স মুখোমুখি হবে রংপুর রাইডার্সের। প্রত্যাশা সেখানেও ঢাকার মতো হবে জমজমাট। মিরপুর শের-ই বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গেল ৩০ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিপিএলের একাদশ আসরের প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে পরশু দিন। এ পর্বে ম্যাচ হয়েছে আটটি আর সবগুলো ছিল জমজমাট। আর দুই একটা ম্যাচ ছাড়া বেশির ভাগই ছিল হাইস্কোরিং ম্যাচ, যা ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য ছিল চমক।
সাধারণত প্রতিবারই বিপিএল শুরু হলে প্রথম পর্বের (মিরপুরের) ম্যাচগুলো মোটামুটি বা লো স্কোরিং দেখা যায়, যা টিকিট কেটে আসা কিংবা টিভির পর্দার সামনে বসে থাকা দর্শকদের জন্য খানিকটা হতাশার। কিন্তু এবার প্রথম ম্যাচ থেকেই দেখা যাচ্ছে বড় রানের সংগ্রহ। যার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান দেশি ব্যাটারদের। তাদের চমক জাগানিয়া স্ট্রাইকরেট ও চার-ছক্কার মারে জমিয়ে তুলেছে আসর। ব্যাটারদের মতো বোলাররাও ছড়াচ্ছে নিজেদের রং, পিছিয়ে নেই ফিন্ডাররাও।
উদ্বোধনী ম্যাচ থেকেই চলছে রানের জোয়ার। ফরচুন বরিশালের বিপক্ষে ৮ ছক্কায় ৪৭ বলে ৯৪ রানের ইনিংস দিয়ে বিপিএলের উড়ন্ত সূচনা করে দেন দুর্বার রাজশাহীর ইয়াসির আলি চৌধুরী। ২০০ ছুঁইছুঁই লক্ষ্যে পরে তাণ্ডব চালান মাহমুদউল্লাহ। মাত্র ২৬ বলে তিনি করেন ৫৬ রান। ফাহিম আশরাফের ব্যাট থেকে আসে ২১ বলে ৫৪ রান। ম্যাচে মোট ছক্কা হয় ২৯টি, যা বিপিএলের রেকর্ড।
ঐ ম্যাচ দিয়েই ক্রিকেটপ্রেমীরা আঁচ পেয়ে যান এবারের আসরে কী হতে চলছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত আট ম্যাচে ছক্কা হয়েছে মোট ১৩২টি। ম্যাচপ্রতি দাঁড়ায় ১৬.৫টি। শেষ দুই দিন ঘন কুয়াশার মধ্যেও ৪ ম্যাচে ৫৮টি ছক্কা মারেন ব্যাটসম্যানরা। অবশ্য এর পেছনে কারণও রয়েছে। সেটা হলো এই টুর্নামেন্টের জন্য সীমানা খানিকটা ছোট করে দেওয়া হয়েছে। তবে উইকেটের আচরণও এবার সন্তোষজনক, স্পোর্টিং যেখানে ব্যাটার এবং বোলার উভয়ই ভালো করতে পারে, যা সচরাচর হোম অব ক্রিকেটে দেখা যায় না।
এ দিকে প্রথম পর্বে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে রয়েছে এনামুল হক বিজয়। শুধু তিনি নয়, সেরা পাঁচ ব্যাটারের মধ্যে তিন জনই বাংলাদেশি। দুর্বার রাজশাহীর বিজয় তিন ম্যাচে দুই ফিফটিতে সর্বোচ্চ রান ১৪৬, চিটাগং কিংসের পাকিস্তানি ব্যাটার উসমান খান ২ ম্যাচে এক সেঞ্চুরিতে ১৪১ রান করেছেন, ঢাকা ক্যাপিটালসের শ্রীলঙ্কান অলরাউন্ডার থিসারা পেরেরা তিন ম্যাচে এক সেঞ্চুরিতে উসমানের সমান রান করেছেন। এছাড়া তিন ইনিংসে দুর্বার রাজশাহীর ইয়াসির আলী ১৩২ ও রংপুর রাইডার্সের সাইফ হাসান ১০৬ রান করেছেন।
এছাড়া ব্যাটিংয়ে সেরা স্ট্রাইক রেটেও দেশের ক্রিকেটারদের দাপটই দেখা গিয়েছে। সর্বোচ্চ ২২৯ স্ট্রাইকরেটে রান করেছেন পাকিস্তানের ফাহিম আশরাফ। বাংলাদেশিদের মধ্যে মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন ২০৬.৮১. শামীম হোসেন ১৯৫.১২, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ১৯৪ ও নুরুল হাসান সোহান ১৮৮ স্ট্রাইকরেটে রান করেছেন।
অন্যদিকে স্পোর্টিং উইকেটে দেশি বোলাররাও পিছিয়ে নেই। দুর্বার রাজশাহীর তাসকিন আহমেদ সর্বোচ্চ ১২ উইকেট নেন মাত্র ৩ ম্যাচেই। তার মধ্যে এক ম্যাচেই ইতিহাস গড়ে নিজের কোটার ৪ ওভারে ১৯ রান দিয়ে নেন ৭ উইকেট। রংপুর রাইডার্সের পাকিস্তানি বোলার খুশদিল শাহ ৭ উইকেট নিয়ে আছেন দ্বিতীয় অবস্থানে। রংপুর রাইডার্সের নাহিদ রানা ও খুলনা টাইগার্সের আবু হায়দার রনি যৌথভাবে নিয়েছেন ৬টি করে উইকেট। আর চিটাগং কিংসের আলিস আল ইসলাম নেন ২ ম্যাচে ৫ উইকেট।
এছাড়া সবচেয়ে কৃপণ বোলিং করা সেরা দুইজনই বাংলাদেশের। খুলনা টাইগার্সের মেহেদী হাসান মিরাজ ওভার প্রতি সর্বনিম্ন ৪ রান করে দিয়েছেন। আর চিটাগংয়ের আলিস আল ইসলাম দেন ৪.২৫ রান করে। তবে এসবের মধ্যে বিপিএল নিয়ে আলোচনা মাঠের বাইরের প্রসঙ্গ নিয়ে। সমস্যাটা হয়েছিল টিকিট নিয়ে যা শুরু হয় টুর্নামেন্ট শুরু আগ থেকেই। বিসিবির পক্ষ থেকেই আগেই জানানো হয়েছিল যে, এবারের টুর্নামেন্টে গ্যালারির বেশির ভাগ আসনের টিকিট পাওয়া যাবে অনলাইনেই।
তবে খেলা শুরুর আগের দিন দুপুর পর্যন্ত টিকিটের কোনো তথ্য জানায়নি বিসিবি। ফলে স্টেডিয়ামের বাইরে সৃষ্টি হয় উত্তাল পরিস্থিতি। এমনকি উদ্বোধনী ম্যাচের দিন স্টেডিয়ামের মূল ফটকও ভাঙে ক্ষুব্ধ দর্শকরা। সেখানেই শেষ নয়, গেল বৃহস্পতিবার সুইমিং কমপ্লেক্সের বুথে সেদিন টিকিট না পেয়ে ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ দর্শকরা। যদিও বিসিবির পক্ষ থেকে জানিয়েছে দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

