শুক্রবার, জুন ১৯, ২০২৬

জমির রেকর্ড সংশোধনের নামে লাখ লাখ টাকা আ’ত্ম’সা’তের অ’ভিযোগ, চাকরিচ্যুত সার্ভেয়ারকে ঘিরে তোলপাড়

কুলাউড়ার দুই ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ; বিভাগীয় কমিশনার, দুদক ও ভূমি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে প্রতিকার প্রার্থনা

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সিলেট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের চাকরিচ্যুত (বরখাস্ত) প্রসেস সার্ভেয়ার সুজিত কুমার দে’র বিরুদ্ধে। জমির রেকর্ড সংশোধন ও নামজারি সংক্রান্ত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগীরা।

সাম্প্রতিক সময়ে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার দুই ভুক্তভোগী তাদের অর্থ ফেরত ও আইনি প্রতিকার চেয়ে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার, ভূমি মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সেনাবাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সুজিত কুমার দে (পিতা: শচীন্দ্র কুমার দে), বর্তমানে সিলেট নগরের গোপালটিলা আবাসিক এলাকায় বসবাসরত, দীর্ঘদিন নিজেকে প্রভাবশালী সরকারি কর্মচারী পরিচয় দিয়ে ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে আসছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, সম্প্রতি এক কর্মকর্তার সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনায় তিনি চাকরি হারালেও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতারণা চক্র এখনও সক্রিয় রয়েছে।

সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কাছে দেওয়া অভিযোগে কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নের সিংহনাদ গ্রামের বাসিন্দা মো. রমজান আলী জানান, ২০২১ সালে সুজিত কুমার দে’র সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মাইজগাঁও মৌজায় নিজের জমির রেকর্ড সংশোধনের জটিলতার সুযোগ নিয়ে সুজিত নিজেকে সেটেলমেন্ট অফিসের প্রভাবশালী কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন এবং কাজ সম্পন্ন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে ৩ লাখ টাকা এবং পরে বিভিন্ন সময়ে আরও অর্থ নিয়ে সর্বমোট ৮ লাখ ৮২ হাজার টাকা গ্রহণ করেন সুজিত। ভুক্তভোগীর দাবি, আস্থা অর্জনের জন্য তিনি নিজ বাসায় কয়েকজনকে কর্মকর্তা পরিচয়ে উপস্থিত করিয়ে বৈঠকেরও আয়োজন করেন। তবে চার বছর পেরিয়ে গেলেও কাজের কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে খোঁজ নিয়ে রমজান আলী জানতে পারেন, সংশ্লিষ্ট মৌজার নথিপত্র অনেক আগেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এরপর থেকে টাকা ফেরত চাইলে অভিযুক্ত ব্যক্তি যোগাযোগ এড়িয়ে চলছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে রাজনগর মৌজার এক দিনমজুরের কাছ থেকেও জমি রেকর্ড সংশোধনের কথা বলে ৯০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জরিপ কার্যক্রম চলাকালে জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকায় অবস্থান করায় ওই ব্যক্তির পৈত্রিক জমি অন্যের নামে রেকর্ড হয়ে যায়। পরবর্তীতে আলমপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের কিছু কর্মচারীর মাধ্যমে সুজিত কুমার দে’র সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। পরে আপিলের মাধ্যমে জমির সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উঠে এসেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, রাজনগর মৌজার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র অফিসের পরিবর্তে এক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বাসভবনে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সেখানে সুজিত কুমার দে ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি নথি অফিসের বাইরে সংরক্ষণের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেওয়ায় তারা বিশ্বাসের ভিত্তিতে অর্থ লেনদেন করেছিলেন এবং কোনো লিখিত রসিদ সংগ্রহ করেননি। তাদের অভিযোগ, সেই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে। তারা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত সাবেক প্রসেস সার্ভেয়ার সুজিত কুমার দে’র ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে ভূমি প্রশাসনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে কুলাউড়া ও আলমপুর সেটেলমেন্ট অফিসকে ঘিরে আরও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সামনে আসতে পারে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ