বৃহস্পতিবার, জুন ১১, ২০২৬

যমুনা রেলওয়ে সেতু প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অ’নিয়মের অ’ভিযোগ, দুদকের অনুসন্ধান শুরু

দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প যমুনা রেলওয়ে সেতু নির্মাণকে ঘিরে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) ও প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের বিরুদ্ধে টেন্ডার কারসাজি, অতিরিক্ত ব্যয়, ভুয়া বিল-ভাউচার, কর ফাঁকি, ঠিকাদারপ্রীতি এবং সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগ তদন্তের আওতায় এসেছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

প্রায় ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে অর্থায়নের বড় অংশ এসেছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) থেকে। দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে দ্রুত ও কার্যকর রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্মিত এই সেতু উদ্বোধনের পর অবকাঠামোগত সাফল্যের পাশাপাশি এর ব্যয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পে SPSP (স্টিল পাইপ শিট পাইল) প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত যথাযথ প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা যাচাই ছাড়াই গ্রহণ করা হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এ কারণে সরকারের প্রায় ৭ হাজার ৪৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা ও নিষ্পত্তির সুপারিশও করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

অডিট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডিটেইল মেজারমেন্ট শিট, অনুমোদিত ড্রয়িং ও বিল অব কোয়ান্টিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ নথি ছাড়াই প্রায় ১২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রিপ্লেসমেন্ট কনসালটেন্টের নামে আরও প্রায় ১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকার অনিয়মিত বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে। বৈদেশিক সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক অর্থবছরেই প্রায় ৭০৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ব্যয় নিয়ে অডিট আপত্তি সৃষ্টি হয়েছে।

কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনাতেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অডিটে বলা হয়েছে, যথাযথ ভাউচার ছাড়াই প্রায় ৩৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা সিডি-ভ্যাট পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া ঠিকাদারদের বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর কর্তন না করায় সরকারের প্রায় ১৭ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভ্যাট পরিশোধ এবং কম আয়কর কর্তনের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কোনো ডিলে ড্যামেজ বা আর্থিক জরিমানা আরোপ করা হয়নি। এর ফলে সরকারের প্রায় ৯৯ কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্ষতি হয়েছে বলে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোবিলাইজেশন ও ডিমোবিলাইজেশন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৪ হাজার ১৫২ কোটি জাপানি ইয়েন বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪১০ কোটি ৬৬ লাখ টাকার ব্যয় বিশেষ পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সহায়ক নথি ছাড়া আরও প্রায় ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকার ব্যয় দেখানোর অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।

বিশেষ আর্থিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, চুক্তিতে নির্ধারিত দেশ থেকে পণ্য আমদানি না করেই প্রায় ৪০৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত SPSP আমদানির কারণে প্রায় ১০৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা শুল্ক ও ভ্যাট পরিশোধের তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অডিটে বিভিন্ন প্যাকেজে অস্বাভাবিক উচ্চ দর ধরে কাজ প্রদান এবং দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সরকারকে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ইউনিট রেট বৃদ্ধি ও নেগোশিয়েশনের মাধ্যমে আরও প্রায় ১ হাজার ৭২৬ কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্ষতির অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।

নির্মাণমান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রেল ট্র্যাকে নির্ধারিত মানের পরিবর্তে নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করা হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে ৪৫ কোটি টাকার বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া নন-টেন্ডার কাজ দেখিয়ে প্রায় ৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।

দুদকে দায়ের করা অভিযোগে প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করে পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দিয়েছেন এবং কমিশন গ্রহণের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই এখনো সম্পন্ন হয়নি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন, টেন্ডার ডকুমেন্ট, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র এবং বিল-ভাউচারসহ বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করা হচ্ছে। অনুসন্ধান শেষে অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, অডিট আপত্তি বা অনুসন্ধান শুরু হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্ত, ব্যাখ্যা এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল রেল অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে যমুনা রেলওয়ে সেতুর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতেও সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ