
নিজস্ব প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা যেন কিছু সরকারি কর্মকর্তার জন্য মধুর খনিতে পরিণত হয়েছে। একবার এই উপজেলায় দায়িত্ব পেলে অনেকেই আর অন্যত্র যেতে চান না। এমন অভিযোগ স্থানীয়দের মুখে দীর্ঘদিনের। এবার সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মাহতাবউদ্দিন চৌধুরী। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বদলি হয়ে নিজ উপজেলা আনোয়ারায় যোগদান করেন তিনি।
প্রায় এক বছর সাত মাস দায়িত্ব পালনের পর চলতি বছরের ১৭ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে বদলির মাত্র দুই দিনের মাথায়, ১৯ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেকটি প্রজ্ঞাপনে পূর্বের বদলির আদেশ বাতিল করা হয়। ফলে তিনি পুনরায় আনোয়ারাতেই বহাল থাকেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, কোন প্রভাব বা অদৃশ্য ক্ষমতার বলে বদলির আদেশ বাতিল হলো এবং কীভাবে তিনি একই কর্মস্থলে থেকে গেলেন? স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, ডা. মাহতাবউদ্দিন চৌধুরীর দায়িত্বকালেই আনোয়ারায় অনুমোদনহীন ও অনিবন্ধিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক এবং ল্যাবের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ফি আদায়, মানহীন চিকিৎসাসেবা এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, একাধিকবার সংবাদ প্রকাশ এবং স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উত্থাপনের পরও কোনো প্রতিষ্ঠান সিলগালা বা উল্লেখযোগ্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
বিশেষ করে সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই জটিল অস্ত্রোপচার পরিচালনার অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। অভিযোগকারীরা জানান, বিষয়টি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে অবহিত করা হলে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানানোর পরামর্শ দেন। পরে তৎকালীন ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি মূলত স্বাস্থ্য বিভাগের আওতাধীন এবং প্রশাসনিক সহায়তা প্রয়োজন হলে তা দেওয়া হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই দায়সারা মনোভাব ও দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু করতে সক্ষম হয়েছে। এদিকে আরও গুরুতর অভিযোগ হিসেবে স্থানীয় মহলে আলোচনা রয়েছে যে, উপজেলার বিভিন্ন অনিবন্ধিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাব থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে জনমনে ব্যাপক প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, ডা. মাহতাবউদ্দিন চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অবৈধ ক্লিনিক, ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি। ফলে ব্যাঙের ছাতার মতো এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে অনিয়ম দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে বলছেন, আনোয়ারার স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম, অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান এবং বদলি-সংক্রান্ত রহস্যের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বলেন, বদলির আদেশটিতে তাঁর নাম ভুলক্রমে চলে এসেছে। আর ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাবে অনেকবার অভিযান চালানো হয়েছে। ইতোমধ্যে আবারও অভিযান চালানোর জন্য এসিল্যান্ড এবং ইউএনওর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। মাসোহারা নেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, এগুলো ভিত্তিহীন কথাবার্তা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তিনটি প্রশ্ন পাঠানো হয়:
(১) আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মাহতাবউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে অনুমোদনহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর মতামত কী?
(২) বদলির আদেশ জারি হওয়ার পরও কীভাবে তা বাতিল হয়ে তিনি একই কর্মস্থলে বহাল থাকলেন?
(৩) নিজ উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় একই উপজেলায় দায়িত্ব পালন করার বিষয়ে সরকারি বিধি বিধান কী বলে? এই প্রশ্নগুলো পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

