
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসন শাখার সদস্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঘুষ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকিতে সহায়তা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন এবং এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। অভিযোগে তার দেশ-বিদেশে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, অস্বাভাবিক ব্যাংক লেনদেন এবং প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
শিল্পপতিদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, এনবিআরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার সময় মোয়াজ্জেম হোসেন বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীর মালিকদের কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ গ্রহণ করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি শিল্পগ্রুপের মালিকদের সঙ্গে স্ট্যাম্পে চুক্তির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা ধার নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে কয়েকটি আর্থিক লেনদেনের উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, এনবিআরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ ধরনের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তা তদন্তের দাবি রাখে।
ছেলের বিদেশে পড়াশোনা ও অর্থপাচারের অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে রাগীব মোয়াজ্জেম যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন, যেখানে প্রতি সেমিস্টারে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই ব্যয়ের অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন রয়েছে এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে হুন্ডি ব্যবহারের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোর এলাকায় তার ছেলে ও পুত্রবধূর নামে একটি বাড়ি কেনার তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশ-বিদেশে বিপুল সম্পদের তথ্য
অভিযোগে মোয়াজ্জেম হোসেন ও তার পরিবারের নামে একাধিক সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবন।
- ঢাকার ধানমন্ডি ও উত্তরায় একাধিক ফ্ল্যাট।
- পূর্বাচলে দুটি প্লট।
- জলসিঁড়ি পূর্বাচল প্রকল্পে একটি প্লট।
- ডিওএইচএস এলাকায় দুটি আবাসিক ইউনিট।
- সাভারের বিরুলিয়ায় বিভিন্ন বিনিয়োগ।
- যুক্তরাষ্ট্রে একটি আবাসিক সম্পত্তি।
- বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ও বিনিয়োগের তথ্য।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এসব সম্পদের সঙ্গে তার ঘোষিত আয়ের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
ঢাকা কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের অভিযোগ
মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঢাকা কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনকালে একাধিক শুল্ক-সংক্রান্ত অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কয়েকটি আলোচিত আমদানি ও শুল্ক সংক্রান্ত ঘটনায় তিনি প্রভাব খাটিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যার ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। কয়েকটি পণ্য জব্দ ও ছাড় সংক্রান্ত ঘটনাও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
যশোর ও রাজশাহীতে দায়িত্ব পালনকালেও অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, যশোর ভ্যাট কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ দাবির অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় আসে।
এছাড়া রাজশাহী ভ্যাট কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর ভ্যাট সংক্রান্ত অনিয়ম ধামাচাপা দিতে আর্থিক সুবিধা চাওয়ার অভিযোগও উত্থাপিত হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
বদলি বাণিজ্য ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
বর্তমানে এনবিআরের কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে মোয়াজ্জেম হোসেন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন পদে বদলি ও পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমেও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের ফলাফল এখনো প্রকাশ হয়নি।
দুদকের অনুসন্ধানের দাবি
দুর্নীতি দমন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, মোয়াজ্জেম হোসেনের ব্যাংক হিসাব, সম্পদের উৎস, বিদেশে অর্থ স্থানান্তর এবং বেনামি সম্পদের বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী কর্মীদের মতে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে জনমনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক বার্তা যাবে।

