সোমবার, মে ১৮, ২০২৬

সিসিকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হানিফুর রহমানকে ঘিরে দু’র্নী’তি, নিয়োগ বাণিজ্য ও অ’বৈধ সম্পদের অ’ভিযোগ

সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসনিক কর্মকর্তা হানিফুর রহমানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের নানা অভিযোগ আলোচনা হয়ে আসছে। যদিও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), আদালত বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা বিচারিক রায় প্রকাশ হয়নি।

তবুও সিসিকের অভ্যন্তরে তিনি “অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা” হিসেবে পরিচিত। নগর ভবনের করিডোরে অনেকে তাকে “মহারাজা” কিংবা “অঘোষিত সম্রাট” বলেও উল্লেখ করেন।

সাধারণ কর্মচারী থেকে প্রভাবশালী কর্মকর্তা

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামের বাসিন্দা হানিফুর রহমান কর্মজীবনের শুরুতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরে তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনে অফিস সহকারী পদে যোগ দেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সময় তিনি সিসিকে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। পরবর্তীতে সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর দায়িত্বকালীন সময়ে তার প্রভাব আরও বাড়ে। প্রশাসনিক শাখার পাশাপাশি কনজারভেন্সি শাখার দায়িত্বও তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ

সিসিকের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে মাস্টাররোল ও দৈনিকভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগে একটি অঘোষিত সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। অভিযোগ রয়েছে, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রার্থীদের কাছ থেকে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো।

বিশেষ করে প্রকৌশল, স্বাস্থ্য, লাইসেন্স ও কনজারভেন্সি শাখায় নিয়োগে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মচারী। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, দুই মেয়াদে অন্তত চার শতাধিক লোককে মাস্টাররোলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং এসব নিয়োগে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে।

শ্রমিকদের বেতন কাটার অভিযোগ

কনজারভেন্সি শাখার শ্রমিকদের বেতন থেকেও নিয়মিত অর্থ কেটে রাখার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে চার দিনের বেতন বিভিন্ন অজুহাতে কেটে নেওয়া হতো। সেই অর্থ কোথায় যেত, তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব শ্রমিকদের কাছে ছিল না।

এছাড়া নগরীর হাসপাতাল, ক্লিনিক, রেস্তোরাঁ ও মার্কেটের বর্জ্য অপসারণের নামে অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

হানিফুর রহমানের পরিবারের নামে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে গড়ে ওঠা “আর.এম ডেইরি ফার্ম” নিয়েও এলাকায় ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় দেড় শতাধিক গরু, মাছের খামার এবং উন্নত জাতের ঘাসের চাষ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগেও তার আর্থিক অবস্থা সাধারণ ছিল। বর্তমানে তার পরিবারের নামে জমিজমা, খামার ও অন্যান্য সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

তবে হানিফুর রহমান অতীতে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ডেইরি ফার্মটি তার স্ত্রীর উদ্যোগে পরিচালিত হয় এবং সম্পদের একটি অংশ তার স্ত্রীর পারিবারিক উৎস থেকে এসেছে।

প্লট বরাদ্দ ও অন্যান্য বিতর্ক

সিসিকের বাগবাড়ি এলাকায় তার স্ত্রীর নামে একটি প্লট বরাদ্দ এবং পরে সেটি সিটি করপোরেশনকে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া ফার্মে ব্যবহৃত কিছু লোহার পিলার সিসিকের বিলবোর্ডের খুঁটি থেকে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও তিনি দাবি করেছেন, এসব সামগ্রী চট্টগ্রাম থেকে কেনা হয়েছে।

সিসিকের ২৮ লাখ টাকা মূল্যের ৫৩৫টি পানির মিটার গায়েব হওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিতেও তিনি সদস্য ছিলেন। তবে ওই তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ হয়নি।

সব অভিযোগ অস্বীকার

হানিফুর রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি কিংবা অনিয়মের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

তিনি আরও বলেন, একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। প্লট বরাদ্দের বিষয়েও তিনি দাবি করেন, চাকরিতে যোগদানের আগেই তার স্ত্রী ওই সম্পত্তি পেয়েছেন।

তদন্ত দাবি সুশাসনকর্মীদের

বর্তমানে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে। প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন খান মো. রেজা-উন-নবী এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার।

সুশাসনকর্মীদের মতে, হানিফুর রহমানকে ঘিরে যেসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে, সেগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনিক অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য ও সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা জরুরি।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ