
মহামান্য হাইকোর্টের এক দশকের পুরোনো একটি আদেশকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে ‘প্রাইভেট’ সিএনজি অটোরিকশা পরিচালনার নামে গড়ে উঠেছে বিশাল এক অনিয়ম ও চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক—এমন অভিযোগ উঠেছে। ‘প্রাইভেট সিএনজি মালিক কল্যাণ সমিতি’ নামের একটি সংগঠনের বিরুদ্ধে আদালতের আদেশের অপব্যাখ্যা করে অবৈধভাবে অর্থ আদায় এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন রাস্তায় নামানোর অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালে দেওয়া একটি হাইকোর্টের নির্দেশনায় সিলভার রঙের কিছু প্রাইভেট সিএনজিকে হয়রানি না করার কথা বলা হয়েছিল। বর্তমানে ওই আদেশের ফটোকপি ব্যবহার করে একটি চক্র সেটিকে কার্যত ‘রোড পারমিট’ হিসেবে চালু করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সমিতির সভাপতি শাহজাহান ও মহাসচিব মো. হোসেন ওই আদেশের ফটোকপির পেছনে স্বাক্ষর দিয়ে চালক ও মালিকদের কাছে তা সরবরাহ করছেন। ৬ মাস থেকে ১ বছরের মেয়াদি এসব তথাকথিত অনুমতির বিপরীতে প্রতিটি গাড়ি থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক চালককে বোঝানো হচ্ছে, এই কাগজ থাকলে ট্রাফিক পুলিশ বা বিআরটিএ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে না।
সূত্র বলছে, হাইকোর্টের মূল আদেশে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি প্রাইভেট সিএনজির কথা উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে রাজধানীতে প্রায় ৩ হাজার ৯০০টি সিএনজি ‘প্রাইভেট’ স্টিকার ব্যবহার করে চলাচল করছে। অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ৪০০টি যানবাহন বৈধ অনুমোদন ছাড়াই রাস্তায় চলাচল করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে একটি সিএনজি অটোরিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল সর্বোচ্চ ১৫ বছর। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর সেগুলো স্ক্র্যাপ করার বিধান রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে চলমান অনেক ‘প্রাইভেট’ সিএনজির বয়স ২০ বছরেরও বেশি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি করছে। বিশেষ করে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ বা যান্ত্রিক ত্রুটির আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো বাণিজ্যিক সিএনজিকে নতুন করে রং করে ‘প্রাইভেট’ হিসেবে পরিচালনা করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চালক জানিয়েছেন, সমিতিকে টাকা না দিলে রাস্তায় গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট সময়ের আদালতের আদেশকে স্থায়ী অনুমতি হিসেবে ব্যবহার করা আইনের পরিপন্থী। একই সঙ্গে এত সংখ্যক সিএনজির বৈধতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সচেতন মহল অবিলম্বে এই অভিযোগের তদন্ত, অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজিগুলো রাস্তা থেকে অপসারণে বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযান দাবি করেছে। তাদের মতে, আদালতের আদেশের অপব্যবহার চলতে থাকলে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রাইভেট সিএনজি মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি শাহজাহান ও মহাসচিব মো. হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

