বুধবার, মে ১৩, ২০২৬

ঘু’ষের অ’ভিযোগে রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের কয়েক কর্মকর্তার বি’রুদ্ধে লিখিত অ’ভিযোগ

ঘুষ গ্রহণ, ব্যাকডেটে রায় প্রদান, নোটিশ গোপন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে জমির প্রকৃত মালিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠেছে রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মোঃ নাজমুল হুদা, নাজির তোফাজ্জল হোসেন, পেশকার মোঃ শামীম হোসেন এবং ভূরুঙ্গামারী সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার লতিফুর রহমান।

এ ঘটনায় কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বাসিন্দা লুৎফর রহমান গত ৬ মে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগটির ডকেট নম্বর-০৬০০৭। একই ধরনের আরেকটি অভিযোগ ৭ মে দায়ের করেন গ্রাম পুলিশ সদস্য ইনছার আলী। অভিযোগকারীদের জমি চর-ভূরুঙ্গামারী মৌজার জে.এল নং-৫০ এলাকায় অবস্থিত।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ৯৩/২৩ নম্বর মিসকেসে বিবাদীপক্ষ ১৯৭০ সালের একটি আমোক্তানামা দলিল উপস্থাপন করে। তবে বাদীপক্ষ দাবি করে, তাদের পূর্বসূরিরা ১৯৬৩ ও ১৯৬৪ সালের বৈধ দলিলের মাধ্যমে প্রায় ২ দশমিক ৫০ একর জমি ক্রয় করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে লুৎফর রহমান গং সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে জমিটি ক্রয় করেন। পরে নামজারি, খাজনা পরিশোধ ও রেকর্ড সংশোধনসহ প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের নামে ডি.আর.এ রেকর্ড ও ডি.পি খতিয়ান প্রস্তুত হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২০ সালে ৩১ ধারার শুনানিকালে উভয় পক্ষ ভূরুঙ্গামারী সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসে হাজির হয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। সে সময় সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার লতিফুর রহমান ঘুষ দাবি করেন বলে অভিযোগ ওঠে। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে ২০২১ সালের ৭ মার্চ লুৎফর রহমানকে গরহাজির দেখিয়ে তার রেকর্ডভুক্ত ১ দশমিক ৬২ একর জমির মধ্যে ১ দশমিক ৪২ একর কর্তন করে বিবাদীপক্ষের অনুকূলে রায় দেওয়া হয়।

পরে প্রতিকার চেয়ে লুৎফর রহমান ৪২(ক) ধারায় আবেদন করলে তা ৯৩/২৩ নম্বর মিসকেস হিসেবে নথিভুক্ত হয়। মামলাটি একবার নথিজাত করা হলেও পুনরায় আবেদনের পর তা সচল করা হয়। সর্বশেষ ৮ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার নাজমুল হুদা জানান, বিবাদীপক্ষের দাখিলকৃত ১৮৭৩৮/৭০ নম্বর আমোক্তানামা দলিলের সত্যতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। পরবর্তীতে ১৪ ও ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে দলিল সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে পৃথক দুটি চিঠি পাঠানো হয়।

অভিযোগকারী দাবি করেন, তদন্ত চলাকালে জোনাল অফিসারের ঘনিষ্ঠ পরিচয়দানকারী এক ব্যক্তি তাকে জানান, “দুই লাখ টাকা দিলে আপনার পক্ষে রায় হবে।” এরপর তিনি ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে অফিসের পেশকার শামীম হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। পরে ২০২৬ সালের এপ্রিলে রায়ের কপি সংগ্রহ করে তিনি দেখতে পান, তার বিপক্ষে ব্যাকডেটে রায় দেওয়া হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে দলিল সংক্রান্ত চিঠিপত্র পাঠানো হলেও রায়ে ৮ এপ্রিল ২০২৫ তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তার নামে বৈধ দলিল, নামজারি ও খাজনার তথ্য থাকা সত্ত্বেও রায়ে দলিলের ধারাবাহিকতা নেই বলে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, বিবাদীপক্ষের নামে খারিজ না থাকলেও রায়ে তাদের নামে খারিজ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, রায়ের তথ্য গোপন রেখে পরে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাকে বলেন, “এখন আর যোগাযোগ করে লাভ হবে না। যারা টাকা দিয়েছে তাদের পক্ষেই রায় হয়েছে।”

লুৎফর রহমান বলেন, “আমার সি.এস, এস.এ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সব বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ঘুষ না দেওয়ায় আমার বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়েছে। এতে আমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।”

তিনি আরও জানান, রায়ের বিষয়ে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসারের সঙ্গে দেখা করলে তিনি বলেন, “রায়ে অসন্তুষ্ট হলে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে যেতে পারেন।”

এদিকে, অপর অভিযোগকারী ইনছার আলীও দাবি করেন, ঘুষ না দেওয়ায় যথাযথ নোটিশ ছাড়াই তার জমি সংক্রান্ত মামলার নথিজাত ও আদেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগকারীরা মহাপরিচালকের কাছে মিসকেস নং-৯৩/২৩ ও সংশ্লিষ্ট আপিল মামলার রায় বাতিল, ডি.পি খতিয়ান বহাল এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের তথ্যমতে, ৫৮টি উপজেলায় মোট ৬ হাজার ৭১০টি মৌজা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মৌজা থেকেই ঘুষ সংক্রান্ত দুটি অভিযোগ জমা পড়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মোঃ নাজমুল হুদা বলেন, “আমি সাংবাদিকবান্ধব মানুষ। বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্টদের তদন্ত করে দেখার নির্দেশ দিয়েছি।”

তবে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ