বুধবার, মে ১৩, ২০২৬

বন্ড সুবিধার আড়ালে শতকোটি টাকার রাজস্ব ফাঁ’কির অ’ভিযোগ, আলোচনায় এনবিআর কর্মকর্তা

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বন্ড ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ দুর্নীতি, শুল্ক ফাঁকি, ঘুষ বাণিজ্য ও অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের যুগ্ম কমিশনার মো. কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এক ভুক্তভোগী।

এক বছরে ৪৩৫ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, যুগ্ম কমিশনার কামরুল ইসলাম এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা ডেপুটি কমিশনার পূরবী সাহার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘রাফায়েত ফেব্রিক্স’ ও ‘এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেড’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাত্র এক বছরে প্রায় ৪৩৫ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কোনো ধরনের কার্যকর যাচাই বা নিরীক্ষা ছাড়াই সম্প্রতি প্রতিষ্ঠান দুটির বন্ডেড সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

নিয়ম অনুযায়ী, শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানিকৃত কাঁচামাল শুধুমাত্র রপ্তানি পণ্য উৎপাদনে ব্যবহারের কথা। তবে অভিযোগ রয়েছে, বন্ড সুবিধায় আনা বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল গোপনে রাজধানীর ইসলামপুর, নয়াবাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে একদিকে বৈধ রপ্তানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

৩০ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সম্প্রতি রাফায়েত ফেব্রিক্সের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম কাস্টমসের প্রিভেন্টিভ নজরদারি শিথিল ও প্রত্যাহারের জন্য বিশেষ প্রশাসনিক তদবির করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই নজরদারি প্রত্যাহারে একটি বিশেষ পত্র জারির বিনিময়ে প্রায় ৩০ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, এই অর্থ লেনদেনের একটি অংশ বিদেশে, বিশেষ করে জাপানে সম্পন্ন হয়েছে। সূত্র জানায়, গত ছয় মাসে কামরুল ইসলাম একাধিকবার জাপান সফর করেছেন এবং সেখানে তাঁর ব্যবসায়িক বিনিয়োগ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন

নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার বাসিন্দা কামরুল ইসলাম ৩০তম বিসিএসের মাধ্যমে কাস্টমস ক্যাডারে যোগ দেন। তবে তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১২ সালে সহকারী কাস্টমস কমিশনার হিসেবে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে যোগদানের পর যশোর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযানের নামে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, কুষ্টিয়ায় দায়িত্ব পালনকালে নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহারকারী বিভিন্ন বিড়ি ও সিগারেট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় এবং দুর্নীতির টাকায় বিলাসবহুল অফিস সাজানোর ঘটনাও ঘটে। সে সময় দুদকের একাধিক অনুসন্ধান শুরু হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

‘ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল নানা অজুহাতে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়। পরে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ঘুষের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘুষ দিলেই দ্রুত ফাইল ছাড় করা হয়, আর অখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই বন্ড সুবিধা পেয়ে যায়।

সম্পদের পাহাড় ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ

কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, ঢাকার অভিজাত এলাকায় তাঁর একাধিক ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল বাগানবাড়ি এবং বিদেশে বিনিয়োগ রয়েছে।

এছাড়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন এবং তাঁর মাধ্যমে শতকোটি টাকার বেশি অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের উদ্বেগ

অর্থনীতি ও রাজস্ব খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বন্ড খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিয়ম দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও রাজস্ব ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাদের মতে, জবাবদিহিতার অভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি অসাধু চক্র রাষ্ট্রীয় সুবিধা ব্যবহার করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করছে।

তারা দ্রুত স্বাধীন তদন্ত, ডিজিটাল নজরদারি জোরদার এবং প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের যুগ্ম কমিশনার মো. কামরুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ