
কর বিভাগে নৈশপ্রহরী হিসেবে চাকরি শুরু করা মো. জুলহাস উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন, ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার এবং জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি চাকরি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে কর অঞ্চল-৩, সার্কেল-৫৯-এ কর্মরত এই কর্মচারী দীর্ঘ চাকরি জীবনে স্বল্প বেতনের চাকরির আড়ালে ঢাকা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল বাড়ি, ফ্ল্যাট ও বিপুল সম্পদের সাম্রাজ্য—এমন অভিযোগ উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
তথ্য অনুযায়ী, জুলহাস উদ্দিন ১৯৯৩ সালের ২৩ মে কর বিভাগে নৈশপ্রহরী হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে অফিস সহায়ক (পিয়ন) এবং সর্বশেষ অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তার মাসিক বেতন প্রায় ২২ হাজার ৪৯০ টাকা।
ভুয়া ঠিকানায় চাকরি নেওয়ার অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাকরিতে যোগদানের সময় তিনি মানিকগঞ্জ জেলার বাসিন্দা পরিচয়ে ভুয়া কাগজপত্র জমা দেন। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে চাকরি স্থায়ী করার সময় মোটা অঙ্কের ঘুষের মাধ্যমে তদন্ত প্রতিবেদনে সেই ভুয়া ঠিকানাকে বৈধ হিসেবে দেখানো হয়।
তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে মানিকগঞ্জে তার কোনো স্থায়ী ঠিকানার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। জাতীয় পরিচয়পত্র ও স্মার্ট কার্ড পর্যালোচনায় দেখা যায়, তার প্রকৃত ঠিকানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর এলাকায়।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জুলহাস উদ্দিন প্রতিবেদকের কাছে বলেন, “আমার ভুল হয়েছে।”
একাধিক স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে প্রশ্ন
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মানিকগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাশাপাশি ঢাকাতেও তার আরেকটি স্থায়ী ঠিকানা রয়েছে। একজন নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীর একাধিক স্থায়ী ঠিকানা ও বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
ফ্ল্যাট, প্রাসাদ ও বিপুল সম্পদের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর খিলগাঁও দক্ষিণ বনশ্রীর একটি অভিজাত এলাকায় এক নিকটাত্মীয়ের নামে কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন জুলহাস উদ্দিন।
এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুলতানপুরে নিজের ও ভাইদের নামে গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বাড়িটির অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও অভিজাত মানের।
অভিযোগে আরও বলা হয়, তার এক ভাই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এবং আরেক ভাই সৌদি আরবে অবস্থান করছেন।
স্বল্প বেতনে ছেলের বিদেশে পড়াশোনা
জুলহাস উদ্দিনের ছেলে দেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়ন করছেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জুলহাস উদ্দিন জানান, দীর্ঘদিন তার বেতন ছিল মাত্র ১৬ হাজার টাকার মতো। তবে এত স্বল্প বেতনে কীভাবে বিদেশে পড়াশোনার ব্যয় বহন করছেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
বরং তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আপনাদের যা মন চায় নিউজ করেন।”
এলাকায় ‘দাতা’ হিসেবে পরিচিত
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরিতে নিম্নপদে থাকলেও এলাকায় জুলহাস উদ্দিন একজন প্রভাবশালী ও বিত্তশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে নিয়মিত অনুদান দিয়ে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেন তিনি।
তদন্তের দাবি
সচেতন মহলের মতে, কর বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা জুলহাস উদ্দিনের সম্পদের উৎস, ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার এবং আয়-ব্যয়ের অসঙ্গতি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের জরুরি তদন্ত দাবি করেছেন।

