
রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের নানা অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর চাকরিতে পুনর্বহালের উদ্দেশ্যে তিনি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি রাবিপ্রবির রিজেন্ট বোর্ডের দশম জরুরি সভায় আবদুল গফুরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে আইসিটি-সংক্রান্ত অপরাধ, প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্থিরতা সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্নের অভিযোগ আনা হয়। পরদিন তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে চিঠি দেন এবং সেখানে নিজেকে ছাত্রদলের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। একই সঙ্গে বরখাস্তাদেশ স্থগিত চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করলেও আদালত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
রাবিপ্রবি স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনসহ ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য পৃথক আবাসিক হল নির্মাণ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে আবদুল গফুর বিভিন্ন খাতে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নির্মাণকাজ শুরুর পর অতিরিক্ত মূল্যে ফার্নিচার ক্রয়, ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। একটি টেবিলের প্রকৃত মূল্য ৮০ হাজার টাকা হলেও তা এক লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখানো হয়। শুধু ফার্নিচার খাত থেকেই প্রায় ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া টিএ/ডিএ বিল গ্রহণের পরও ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের নামে দ্বিতীয়বার অর্থ উত্তোলনের মাধ্যমে প্রায় ৭ লাখ ১১ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চারটি ভবনের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ঠিকাদারদের কাছ থেকে এক শতাংশ হারে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা কমিশন নেওয়ার বিষয়েও অভিযোগ করা হয়েছে, যা নিয়ে কয়েকজন ঠিকাদার দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রতিষ্ঠানের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট নির্মাণ বাবদ ৩৭ লাখ টাকা এবং পরিকল্পিত বনায়নের নামে প্রায় ৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। এছাড়া সরকারি প্রকল্পের অর্থ দিয়ে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য আসবাবপত্র কেনার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আলমারি, চেয়ার-টেবিল, খাট ও ফাইল কেবিনেটসহ বিভিন্ন আসবাব প্রকল্পের অর্থে কেনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রকল্পে কর্মরত বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে নিয়মবহির্ভূতভাবে অগ্রিম টাকা উত্তোলনের ঘটনাও সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকজন কর্মচারীর নামে মোট কয়েক কোটি টাকা অগ্রিম উত্তোলন করে বিভিন্ন খাতে সমন্বয় দেখানো হয়েছে। কিছু ফাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাক্ষরও পাওয়া যায়নি।
২০১৭ সালে পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরে সহকারী পরিচালক হিসেবে আবদুল গফুরের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বয়সসীমা ও যোগ্যতার বিভিন্ন শর্ত পূরণ না হলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি নিয়োগ পান।
এছাড়া পরিবেশগত অনুমোদন ও এনভায়রনমেন্টাল ইমপেক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) রিপোর্ট ছাড়াই পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পরে এ ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলার আসামি হন তিনি।
রাবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক মো. আতিয়ার রহমান বলেন, প্রকল্পে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয় সামনে আসার পর আবদুল গফুরকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। সবদিক বিবেচনা করে রিজেন্ট বোর্ড তাকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আবদুল গফুরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

