বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৬

আউটসোর্সিং কর্মচারীদের সিন্ডিকেট কাণ্ড: দুর্যোগ অধিদপ্তরে কোটি টাকার দুর্নীতির বিস্ফোরণ

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতাধীন আউটসোর্সিং খাতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং নিয়োগ-বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে। সরকারি অনুমোদন ছাড়াই চাকরি দেওয়ার নাম করে অর্থ আত্মসাৎ এবং কর্মরত কর্মীদের বকেয়া বেতন পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন তিনজন মূল ব্যক্তি:

রাজা:আউটসোর্সিং কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি (বর্তমানে মেহেরপুরে কর্মরত),সাজ্জাদ: আউটসোর্সিং কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক (সিরাজগঞ্জে কর্মরত),মুকুল:আউটসোর্সিং কর্মচারী ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক (নাটোরে কর্মরত)।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা নিজ নিজ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে অধিকাংশ সময় ঢাকার বিলাসবহুল আবাসিক হোটেলে অবস্থান করেন। তাদের চলাফেরা এবং জীবনযাত্রার মান আয়ের উৎসের সাথে অসংগতিপূর্ণ। অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে এই চক্রটি একটি সুসংগঠিত ‘সিন্ডিকেট’ হিসেবে কাজ করছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, সিন্ডিকেটটি মূলত তিনটি স্তরে তাদের প্রতারণা জাল বিস্তার করেছে:

রাজস্বকরণের নামে কোটি টাকা: ২০১৭ সাল থেকে কর্মরত আউটসোর্সিং কর্মীদের চাকরি রাজস্বকরণের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অন্তত ৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বকেয়া বেতন পাইয়ে দেওয়ার ঘুষ: বর্তমানে কর্মরত ৪৮৪ জন কর্মীর বকেয়া বেতন ছাড় করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়েছে।

ভুয়া নিয়োগ বাণিজ্য: ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ‘ISO Component-6’ প্রকল্পের নিয়োগকে কেন্দ্র করে তারা সবচেয়ে বড় জালিয়াতি শুরু করে। সরকারি কোনো অনুমোদন ছাড়াই ‘মামলার মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ’ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে প্রায় ৩৪ জন চাকরিপ্রত্যাশীর কাছ থেকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা করে অন্তত ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চক্রের খপ্পরে পড়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র মানুষগুলো সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। একটি চাকরির আশায় কেউ হালের গরু বিক্রি করেছেন, কেউ জমি বন্ধক রেখেছেন, আবার কেউ চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সিন্ডিকেটের হাতে টাকা তুলে দিয়েছেন। দীর্ঘদিন পার হলেও চাকরি না পেয়ে টাকা ফেরত চাইতে গেলে উল্টো নানাভাবে হয়রানি ও হুমকির শিকার হতে হচ্ছে তাদের।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, প্রাপ্ত অভিযোগটি প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। অপরাধের গভীরতা বিচার করে শিগগিরই অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং নথিপত্র সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় এ ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে ওঠা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত। তারা বলছেন, এখনই যদি এই ‘কালো থাবা’ থেকে দপ্তরটিকে মুক্ত করা না যায়, তবে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়ের জায়গাটিও বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ