মঙ্গলবার, জুন ২, ২০২৬

নবীন ফ্যাশনের দোকান বন্ধ: আদালতে হাতিরঝিল থানার ওসি গোলাম মর্তুজার নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা

নবীন ফ্যাশনের দোকান বন্ধ: আদালতে হাতিরঝিল থানার ওসি গোলাম মর্তুজার নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা

এসিএম নিউজ, ঢাকা

রাজধানীর মগবাজার এলাকায় নবীন ফ্যাশনের একটি পাঞ্জাবির দোকান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মর্তুজা। আজ রোববার (২৯ মার্চ) তিনি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে জবাব দাখিল করেন এবং ক্ষমা চান।
নবীন ফ্যাশনের দোকান বন্ধের বিষয়ে হাতিরঝিলের ওসি ব্যাখ্যাও দেন। ব্যাখ্যায় আদালতকে তিনি জানান, আকর্ষণীয় অফারকে কেন্দ্র হঠাৎ অতিরিক্ত ভিড়ের কারণেই ওই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তিনি আদালতকে বলেন, আদালত যদি মনে করেন পুলিশের কোনো ভুল ছিল, তাহলে তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা চাইছেন এবং ভবিষ্যতে আরও সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করবেন।
ওসি আদালতকে জানান, মগবাজারের বিশাল সেন্টারে প্রায় ৩ বছর ধরে নবীন ফ্যাশন একটি পোশাকের দোকান চালাচ্ছে। তারা কম দামে পণ্য বিক্রি করে এবং বিভিন্ন সময় আকর্ষণীয় অফার দেয়। গত ২০ মার্চ নবীন ফ্যাশন একটি বড় অফার দেয়—২টি পাঞ্জাবি কিনলে ৪টি ফ্রি, বাইকারদের জন্য ইঞ্জিন অয়েল ফ্রি, এমনকি রিকশা ভাড়াও ফ্রি। তারা ফেসবুক ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে এই প্রচার করে। এতে করে জুমার নামাজের আগ থেকেই দোকানের সামনে প্রচুর ভিড় জমে যায়। প্রতি মুহূর্তে প্রায় ১০০–১২০টি মোটরসাইকেল আসা-যাওয়া করতে থাকে।

এই অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে দোকানের সামনে, পার্কিংয়ে এবং আশেপাশের দোকানগুলোর সামনে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। নবীন ফ্যাশন এই চাপ সামাল দিতে না পেরে বিকেল ৫টার দিকে ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে তাদের অফার বন্ধ করে দেয় এবং দোকানের সামনে শাটার নামিয়ে দেয়। কিন্তু তখনও ক্রেতারা পেছনের গেট দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করে, ফলে পরিস্থিতি আরও অগোছালো হয়ে যায়।
এ অবস্থায় মার্কেটের সিকিউরিটি গার্ড বিষয়টি কমিটির সভাপতি তৈয়ব আলী, সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন মাইকেলসহ অন্যদের জানায়। তারা দোকানে গিয়ে নবীন ফ্যাশনের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। তখন সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি ঠান্ডা করার জন্য তাদের বাইরে নিয়ে আসে।
ঈদ উপলক্ষ্যে ওই মার্কেটে আগেই পুলিশ মোতায়েন ছিল। দায়িত্বে থাকা এএসআই আরিফুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, দোকানের সামনে ও ভেতরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, ক্রেতারা বিশৃঙ্খলভাবে ঢোকার চেষ্টা করছে। তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং ভিড় সরিয়ে দেন। তার কারণে কোনো মারামারি, ভাঙচুর বা লুটপাট হয়নি।

ওসি আদালতকে আরো জানান, তিনি ওয়্যারলেসে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি জানতে থাকেন। পরে ফোনে এএসআই আরিফুল ইসলাম থেকে বিস্তারিত জানেন। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আছে জেনে তিনি অতিরিক্ত ফোর্স না পাঠিয়ে পরে আরেকজন অফিসারকে পাঠান।
পরে তিনি নবীন ফ্যাশনের মালিক এনামুল হাসান নবীনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং দোকান খোলার অনুরোধ করেন। কিন্তু মালিক বলেন, তার ঢাকায় অনেক দোকান আছে, এই দোকান নিয়ে তিনি ভাবছেন না এবং সেদিন আর দোকান খুলবেন না। রাতে ওসি নিজে ঘটনাস্থলে যান। দোকান বন্ধ থাকায় নবীন ফ্যাশনের কাউকে না পেয়ে মার্কেট কমিটির লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন। পরে থানায় একটি জিডি করা হয়।
এরপর রাতে দোকানের মালিক ফোন করে অভিযোগ করেন, প্রিন্স ফ্যাশনের মালিক তার কর্মচারীদের হুমকি দিয়েছেন। ওসি তাকে বলেন, আগে মার্কেট কমিটির কাছে অভিযোগ করতে, প্রয়োজনে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।
ওসি আরও বলেন, সংবাদ সম্মেলনে মালিক যে দাবি করেছেন—তিনি নাকি বলেছেন “মার্কেট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পারবেন না, তারা প্রধানমন্ত্রীর লোক”—এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
পরদিন ২৬ মার্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, পুলিশ উপস্থিতিতে নবীন ফ্যাশনের দোকান খুলে দেওয়া হয় এবং নিরাপদে ব্যবসা চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়।
ওসি জানান, ঘটনার সময় যারা জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে মার্কেট কমিটির সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সিকিউরিটি ইনচার্জ এবং নবীন ফ্যাশনের ম্যানেজার ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলা ও চাপ থাকায় পরিস্থিতি সংবেদনশীল থাকে। এই ঘটনাতেও হঠাৎ বড় ভিড় হওয়ায় ভয় ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। তবে পুলিশ ধৈর্য ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে।
উল্লেখ্য, গত ২৫ মার্চ মগবাজারের ‘নবীন ফ্যাশন’-এর শোরুম জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশ কেন নীরব ছিল তার কারণ দর্শাতে হাতিরঝিল থানার ওসিকে নির্দেশ দেন এই আদালত। একইসঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোকানটি খুলে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের আদেশে বলা হয়, একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত এক খবরে দেখা যায়, মগবাজারের বিশাল সেন্টার মার্কেটের ‘নবীন’ ব্র্যান্ডের একটি পাঞ্জাবির দোকানে একদল লোক পুলিশসহ উপস্থিত হয়ে দোকান বন্ধ করে দেয়। ঘটনাস্থলে কিছু ব্যক্তিকে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করতেও দেখা যায়। তবে এ সময় পাশে থাকা পুলিশ সদস্যরা নির্লিপ্ত ছিলেন। পুলিশের এমন আচরণ জনমনে ভীতি সৃষ্টি করতে পারে। কেন এ ধরনের আচরণ আইনবহির্ভূত ও পেশাদারিত্ববিরোধী হিসেবে ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে হাতিরঝিল থানার ওসিকে তিন দিনের মধ্যে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হলো।
গত ২০ মার্চ রাজধানীর মগবাজারে কম দামে পাঞ্জাবি বিক্রি করাকে কেন্দ্র করে ‘নবীন ফ্যাশন’ নামে দোকান বন্ধ করে দেয় আশপাশের ব্যবসায়ীরা। প্রতিবেশী দোকানদাররা কমদামে পণ্য বিক্রিকে ‘রিলিফ দেওয়ার’ সঙ্গে তুলনা করে আপত্তি জানান। পরে পুলিশের সহায়তায় বিকেলে জোরপূর্বক দোকানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এরপর গত ২৪ মার্চ মঙ্গলবার নবীন ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাফেজ এনামুল হাসান সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসা গুটিয়ে বিদেশ চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। পরে তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশেও চলে যান।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ