Saturday, August 29, 2026

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে ‘মিজান সি’ন্ডি’কেট’, বদলি-পারমিট-লাইসেন্সে ঘু’ষে’র অভিযোগ

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে ঘুষ, বদলি বাণিজ্য, ভুয়া জোত পারমিট এবং স’মিলের লাইসেন্স নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে অফিস সহকারী খান মিজানুল রহমান মিজানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। তাঁর কর্মকাণ্ডে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, বদলি, কাঠ পরিবহন ও স’মিল-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে মিজানের প্রভাব রয়েছে। এমনকি বিভাগীয় বন কর্মকর্তার (ডিএফও) সিদ্ধান্তও নানা কৌশলে প্রভাবিত করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন মিজান। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকেন না। প্রতি সপ্তাহের রবি বা সোমবার ঢাকা থেকে বিমানে চট্টগ্রামে এসে অফিসে যোগ দেন এবং বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যেই আবার ঢাকায় ফিরে যান। ফলে সপ্তাহের বেশিরভাগ সময় তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডিএফওদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে নতুন কোনো বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) যোগ দিলে মিজান বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে কিংবা নানা কৌশলে তাঁর ওপর প্রভাব বিস্তার করেন।

অভিযোগ রয়েছে, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত তাঁর স্ত্রীর ভাই ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফজলুর হক লাভলুর ক্ষমতার প্রভাবের কথাও বিভিন্ন সময় ব্যবহার করেন মিজান। এর মাধ্যমে ডিএফওদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

ফলে মিজানের ইচ্ছার বাইরে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বদলিতে নির্দিষ্ট ‘রেট’ থাকার অভিযোগ

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বদলি প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী বদলি কমিটির সুপারিশ এবং ডিএফওর অনুমোদনের পর বদলি আদেশ জারি হওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগকারীদের দাবি, মিজানকে অর্থ না দিলে সেই আদেশ আটকে দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, দাবি করা অর্থ না দিলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পোস্টিং দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। এমনকি শাস্তিমূলক বদলির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পদে পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে মিজানের নির্ধারিত অর্থের হার রয়েছে। চেক স্টেশনে পোস্টিং পেতে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা এবং রেঞ্জ ও বিটের ধরন অনুযায়ী ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ফরেস্ট গার্ড অভিযোগ করেছেন, পছন্দের স্থানে বদলি করে দেওয়ার কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া হলেও পরে বদলি করা হয়নি। এমনকি নেওয়া অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি বলে তাঁরা দাবি করেছেন।

ভুয়া জোত পারমিটে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ

মিজানের বিরুদ্ধে কাঠ পাচার ও ভুয়া পারমিটের সঙ্গেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভিন্ন রেঞ্জে ইস্যু হওয়া কথিত ভুয়া জোত পারমিটের কাগজপত্র ও ছাড়পত্র তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্ত, খাড়া মার্কা, পাশ মার্কা এবং ট্রানজিট পাস (টিপি) দেওয়ার অনুমোদনের ক্ষেত্রে কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘনফুটপ্রতি ১০ টাকা বা ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশি কমিশন নেওয়া হয়।

মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মিজানের মাধ্যমে এসব কথিত ভুয়া জোত পারমিট অনুমোদন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

মেয়াদোত্তীর্ণ স’মিলের লাইসেন্স নবায়নের অভিযোগ

স’মিলের লাইসেন্স নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, করাতকল (লাইসেন্স) বিধিমালা, ২০১২-এর নিয়ম উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন মেয়াদোত্তীর্ণ থাকা স’মিলের লাইসেন্সও অর্থের বিনিময়ে নবায়ন করে দেওয়া হচ্ছে।

বিধিমালার ৬ নম্বর ধারার ১ ও ২ উপধারা অনুযায়ী, স’মিলের লাইসেন্সের মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন মাস অতিক্রান্ত হলে নির্ধারিত জরিমানা দিয়ে তা নবায়নের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, মিজান ২ থেকে ৪ বছর পর্যন্ত মেয়াদোত্তীর্ণ থাকা স’মিলের লাইসেন্সও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নবায়ন করে দেন।

এ ক্ষেত্রে কখনো রেঞ্জ কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়, আবার কখনো নিজেই কথিত ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করেন বা ডিএফওকে বিভ্রান্ত করে স্বাক্ষর করিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নতুন স’মিলের লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রেও মিজানকে অর্থ না দিলে কাজ এগোয় না বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন

বিভিন্ন অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মিজানের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অর্থের মাধ্যমে তিনি ঢাকার অভিজাত এলাকায় দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন।

তবে এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস এবং তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের অভিযোগ, অফিস সহকারী হয়েও মিজান দীর্ঘদিন ধরে এমন প্রভাব তৈরি করেছেন যে বদলি, পারমিট ও লাইসেন্স-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তাঁর হস্তক্ষেপ রয়েছে।

তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনা এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বন বিভাগের ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ