Saturday, August 29, 2026

২০০ রেল কোচ কেনায় ব্যয়ের নথিতে ২২১ ভুল, তিন গাড়ির ভাড়ায় ৩০০ কোটি টাকার হিসাব!

বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০০টি আধুনিক স্টেইনলেস স্টিলের ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনার প্রকল্পে ব্যয়ের হিসাব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের আর্থিক নথি পর্যালোচনায় অস্বাভাবিক ও অসংগতিপূর্ণ একাধিক ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এমনকি একটি জিপ, একটি মাইক্রোবাস ও একটি সেডান গাড়ি ভাড়া বাবদ কর ও ভ্যাটসহ ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানোর তথ্যও রয়েছে নথিতে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ২০ মে ভারতের রেল ইন্ডিয়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক সার্ভিস (আরআইটিইএস) লিমিটেডের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনার চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের পাঞ্জাবের কাপুরথালা রেল কোচ ফ্যাক্টরি থেকে এসব কোচ সরবরাহ করার কথা। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ২৯৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

বর্তমানে চুক্তির প্রথম চালানের ১৯টি কোচ দর্শনা সীমান্তে অবস্থান করছে। তবে কোচগুলো দেশে আসার আগেই প্রকল্পের আর্থিক নথি নিয়ে সামনে এসেছে নানা অসংগতি। রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ আর্থিক নথি ও পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের মূল কাজের বাইরে এমন কিছু খরচ রাখা হয়েছে, যার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তিন গাড়ির ভাড়া ৩০০ কোটি টাকা

প্রকল্পের ব্যয়ের খাতগুলোতে সবচেয়ে বেশি বিস্ময় তৈরি করেছে তিনটি গাড়ির ভাড়ার হিসাব। নথি অনুযায়ী, একটি জিপ, একটি মাইক্রোবাস এবং একটি সেডান গাড়ি ভাড়া বাবদ কর ও ভ্যাটসহ ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ক্যারেজ ও ওয়াগন কারখানা, পার্বতীপুর ও ঈশ্বরদীতে কমিশনিং ও প্রক্রিয়াকরণ বাবদ বিপুল অঙ্কের অর্থের হিসাব রাখা হয়েছে। প্রকল্পের নথিতে এ খাতে প্রায় ৪ লাখ ৯০ হাজার পনেরো কোটি ২৭ লাখ টাকা দেখানোর তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

মূল প্রকল্পের বাইরে ১৩৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ‘চতুর্থ রিলিফ ক্রেন’ যুক্ত করার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর বিপরীতে রিলিফ ক্রেন-সংক্রান্ত পরামর্শক ফি হিসেবে ৯০১ কোটি ২০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

একইভাবে ইলেকট্রিক সাব-স্টেশন ও চারটি হুইল লেদ মেশিনের বিদ্যুতায়নে ৬০০ কোটি টাকা এবং ২০০টি কোচের নকশা যাচাই ও পরামর্শক সেবার জন্য ২১৪ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে।

আর্থিক নথিতে ২২১টি ভুলের অভিযোগ

গত ২৪ জুনের একটি পর্যালোচনায় প্রকল্পের আর্থিক নথিতে অন্তত ২২১টি গুরুতর ভুল শনাক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। একজন আর্থিক বিশ্লেষকের মতে, নির্দিষ্ট কাজের উল্লেখ না থাকলেও একজন পরামর্শকের ৪৮ মাসের সম্মানি হিসেবে ৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

এ ছাড়া অন্যান্য পরামর্শকের ফি এবং ক্রেন ও লেদ মেশিন-সংক্রান্ত পরামর্শক ফি দশমিকের পর ছয় ঘর পর্যন্ত অবিকল অন্য একটি রেলপথ নির্মাণ চুক্তির তথ্য থেকে কপি করে বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্রয় পরিকল্পনার প্রধান তিনটি প্যাকেজের ব্যয়-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নথিতে ফাঁকা রাখা হয়েছে।

কাজের অগ্রগতি শূন্য, অথচ আগেই কেনাকাটা

প্রকল্পটির মূল পরিকল্পনা করা হয়েছিল ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) অর্থায়নে এর মোট ব্যয় ১ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি শূন্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অথচ কোচ দেশে পৌঁছানোর আগেই প্রকল্প কার্যালয়ের জন্য কম্পিউটার, প্রিন্টার ও আসবাবপত্র কেনায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়ের অগ্রাধিকার এবং অর্থ ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে অর্থ ছাড়ের শর্ত। মূল যন্ত্রপাতি সরবরাহের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রথম দুই বছরে মোট বরাদ্দের ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ ৮২৯ কোটি ১২ লাখ টাকা ছাড় করার শর্ত রাখা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া ব্যাংক-সংক্রান্ত ব্যয়ের একটি খাত কোনো দরপত্র ও ঋণদাতার তদারকি ছাড়াই রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

রেল সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অতীতের বিভিন্ন ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়মের মতো এই প্রকল্পের ক্ষেত্রেও বিষয়গুলো আড়াল করার চেষ্টা হতে পারে। এমনকি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে পাঠিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তারা।

তাদের মতে, প্রকল্পের প্রতিটি ব্যয়ের যৌক্তিকতা, দরপত্র ও ক্রয়প্রক্রিয়া, পরামর্শক নিয়োগ, অর্থ ছাড়ের শর্ত এবং আর্থিক নথির অসংগতিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে অবিলম্বে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে কঠোর ও নিরপেক্ষ তদারকি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ