
নেত্রকোনার বিভিন্ন উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা কামাল হোসেন খানের বিরুদ্ধে বারবার অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অতিরিক্ত ভূমি কর আদায়, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, ঘুষ গ্রহণ এবং প্রকৃত মালিকানার চেয়ে বেশি জমি খারিজ করে দেওয়ার অভিযোগে একাধিকবার বদলি করা হলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ধারাবাহিকতা থামেনি বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সর্বশেষ কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত অবস্থায়ও তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। সম্প্রতি সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
একাধিক কর্মস্থলে অভিযোগ
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, ২০২১-২২ সালে বারহাট্টা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালে কামাল হোসেন খানের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে অর্পিত সম্পত্তি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে খারিজে সহায়তা এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের পর একাধিক ব্যক্তি জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
পরবর্তীতে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তাকে নেত্রকোনা সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়। তবে সেখানেও একই ধরনের অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সালে তাকে মোহনগঞ্জ উপজেলার সমাজ-সহিলদেও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে স্থানান্তর করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ওই ইউনিয়নে দায়িত্ব পালনকালে অতিরিক্ত খাজনা আদায়, ঘুষ গ্রহণ, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি এবং মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে অতিরিক্ত জমি খারিজ করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পর তদন্তে কিছু অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে গত বছরের অক্টোবরে তাকে কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়।
ভাইরাল ভিডিও ঘিরে সমালোচনা
বদলির পরও অভিযোগ থেমে নেই বলে দাবি স্থানীয়দের। সম্প্রতি পোগলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি ঘিরে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও প্রভাবশালী মহলের তদবিরে তিনি চাকরিতে বহাল রয়েছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে মনে করছেন অনেকে।
অতিরিক্ত জমি খারিজের অভিযোগ
মোহনগঞ্জ উপজেলার সমাজ-সহিলদেও ইউনিয়নে দায়িত্ব পালনকালে একটি জমি খারিজসংক্রান্ত ঘটনায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, সহিলদেও মৌজার ২০৮৬ নম্বর বিএস দাগে মোট জমির পরিমাণ ৭১ শতাংশ। এর মধ্যে ৩৫ দশমিক ৫০ শতাংশ জমির মালিক জয়নুল আবেদিন এবং অবশিষ্ট ৩৫ দশমিক ৫০ শতাংশ জমির মালিক নজরুল ইসলাম।
অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে নজরুল ইসলাম তার প্রকৃত অংশের চেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৪০ শতাংশ জমি খারিজ করে নেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের এপ্রিলে জয়নুল আবেদিন তার অংশের ৩৫ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি খারিজ করেন। এতে মোট ৭১ শতাংশ জমির বিপরীতে খারিজের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৫ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এরপরও গত বছরের ৩১ আগস্ট জয়নুল আবেদিনের নামে আরও প্রায় ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি খারিজ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্তে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
অভিযোগ অস্বীকার
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা কামাল হোসেন খান।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, “এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি বিল ৩০ হাজার টাকায় খাস কালেকশনে দেওয়া হয়েছিল। ওইদিন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি খাস কালেকশনের অংশ হিসেবে ৫০০ টাকা আমার কাছে জমা দেন। কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে সেই দৃশ্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে।”
তদন্ত ও জবাবদিহিতার দাবি
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও সেবাগ্রহীতারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বারবার অভিযোগ ওঠার পরও যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভূমি অফিসের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।
তারা মনে করেন, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

