
রাজধানীর গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধন, নকল উত্তোলন এবং দলিল অনুসন্ধান কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও সরকারি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অফিসটির নকলনবিশ মো. গিয়াসউদ্দিন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বহিরাগতদের নিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে তিনি অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দলিল তল্লাশি, নকল উত্তোলনসহ বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া জালিয়াতি, অনিয়ম এবং বিধিবহির্ভূতভাবে কাজ সম্পাদনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ক্ষমতার প্রভাব ও অফিস পরিচালনায় অস্বাভাবিক কর্তৃত্বের কারণে সংশ্লিষ্ট মহলে তিনি ‘বিকল্প সাব-রেজিস্ট্রার’ হিসেবেও পরিচিত বলে জানা গেছে।
জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ
সম্প্রতি গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে কেন্দ্র করে জমির প্রকৃত শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকির একটি অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, উচ্চমূল্যের বসতভিটা শ্রেণির জমিকে দলিলে ‘নাল জমি’ হিসেবে দেখিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়েছে, যার ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৬ সালের ৩ মে সম্পাদিত ৩৪৫৯ নম্বর একটি সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে প্রায় ১০ দশমিক ৬৬ কাঠা জমি হস্তান্তর করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, জমিটির প্রকৃত শ্রেণি ছিল বসতভিটা; তবে দলিলে সেটিকে ‘নাল জমি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় সরকারি রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে এবং এর সঙ্গে নকলনবিশ গিয়াসউদ্দিনের সম্পৃক্ততার অভিযোগও করা হয়েছে।
রেকর্ডরুমে বহিরাগত প্রবেশ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, গিয়াসউদ্দিন ক্ষমতার অপব্যবহার করে রেকর্ডরুমে বহিরাগতদের প্রবেশের সুযোগ করে দেন, যা প্রচলিত বিধিবিধানের পরিপন্থী। এছাড়া নকল ও সার্চিং ফি বাবদ আদায়কৃত অর্থের সঙ্গে ট্রেজারি চালানে জমা হওয়া অর্থের অসঙ্গতির অভিযোগও রয়েছে।
সেবাগ্রহীতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অফিসটিতে বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের একটি অলিখিত সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ফলে সাধারণ মানুষকে সরকারি সেবা পেতে অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
জাল কাগজপত্রে দলিল নিবন্ধনের অভিযোগ
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, গিয়াসউদ্দিন ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দালালচক্র মালিকানার ইতিহাস যথাযথভাবে যাচাই না করেই জাল বা প্রশ্নবিদ্ধ কাগজপত্রের ভিত্তিতে দলিল নিবন্ধনে সহায়তা করছে। এর ফলে প্রকৃত মালিকরা সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গুলশান এলাকার জমির উচ্চমূল্যের কারণে এ ধরনের অনিয়মের আর্থিক প্রভাবও ব্যাপক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
একাধিক সূত্রের দাবি, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গিয়াসউদ্দিনের উচ্চপর্যায়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল। স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং পূর্বের প্রভাববলয় বজায় রেখেই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

