বৃহস্পতিবার, জুন ১৮, ২০২৬

নিউজিল্যান্ড ডেইরির বি’রু’দ্ধে প্রায় ২০ কোটি টাকার ভ্যাট অ’নিয়মের অ’ভিযোগ

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রায় ২০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি, অবৈধ কর রেয়াত গ্রহণ এবং রাজস্ব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কোম্পানিটিকে দাবিনামাসহ কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে নিরীক্ষা দল বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম শনাক্ত করে। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধভাবে উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণ, ভ্যাটযোগ্য পণ্য সরবরাহে কর পরিশোধ না করা, বিক্রির তথ্য গোপন রাখা, উৎসে মূসক কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া এবং অন্যান্য আয়ের বিপরীতে ভ্যাট পরিশোধ না করা।

১৯৯২ সালে নিউজিল্যান্ডভিত্তিক দুগ্ধ সমবায় প্রতিষ্ঠান ফনটেরার অপারেটিং পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে নিউজিল্যান্ড ডেইরি। এলটিইউভুক্ত প্রতিষ্ঠানটির ওপর ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর নিরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। নিরীক্ষা দল চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়।

অবৈধ কর রেয়াত গ্রহণের অভিযোগ

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয় কিংবা উপকরণ-উৎপাদন সহগে ঘোষিত নয়—এমন বিভিন্ন পণ্যের বিপরীতে কোম্পানিটি উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণ করেছে।

স্থানীয়ভাবে ক্রয় করা গাজী মাল্টিপারপাস বাসকেট, সানফ্লাওয়ার অয়েল, প্লাস্টিক হ্যাঙ্গার, মার্জারিন ও ক্লক ডিসপ্লে বোর্ডের বিপরীতে ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৭৬৮ টাকার অবৈধ রেয়াত নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এছাড়া প্রেসার সুইচ, মেটাল ডিটেক্টর, ফ্ল্যাশ মেমোরি কার্ড, ফিউজ, রিলে, টাচ প্যানেল কম্পিউটার, এসডি কার্ড, পাওয়ার ক্যাবল ও ডিজিটাল ফাইবার সেন্সরসহ বিভিন্ন আমদানিকৃত পণ্যের বিপরীতে আরও ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৭১ টাকার রেয়াত গ্রহণের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আটা-ময়দা-সুজি ও সরিষার তেলে ভ্যাট না দেওয়ার অভিযোগ

নাটোরের চকরামপুরে অবস্থিত ক্রিস্টাল গ্রেইনস লিমিটেডে উৎপাদিত ফার্মল্যান্ড ব্র্যান্ডের আটা, ময়দা ও সুজি এবং শেফস চয়েস ব্র্যান্ডের সরিষার তেল নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্যাকেটজাত অবস্থায় ক্রয় করে কোনো ধরনের রূপান্তর ছাড়াই বাজারজাত করেছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এনবিআরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উৎপাদন পর্যায়ে এসব পণ্য ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত হলেও ব্যবসায়ী পর্যায়ে সরবরাহের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০ কোটি ৩১ লাখ ৭৯ হাজার ৮১৪ টাকার এসব পণ্য সরবরাহের বিপরীতে ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৯৯০ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি।

একই সঙ্গে রপ্তানি, অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও শূন্যহারভুক্ত পণ্য সরবরাহে ব্যবহৃত বিভিন্ন সেবার বিপরীতে ৯ লাখ ৭৩ হাজার ৪৭৭ টাকার অবৈধ কর রেয়াত গ্রহণের অভিযোগও করা হয়েছে।

ডেটস চিকেন ও প্রপার কোকোনাট উৎপাদনে অসঙ্গতি

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডেটস চিকেন ও প্রপার কোকোনাট পণ্য উৎপাদনে ঘোষিত উপকরণের তুলনায় অতিরিক্ত কাঁচামাল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওই অতিরিক্ত উৎপাদনের তথ্য ভ্যাট রিটার্নে দেখানো হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর ফলে ৭৫ লাখ ৩৯ হাজার ২০৯ টাকার ভ্যাট পরিশোধ এড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেছে এনবিআর।

এছাড়া অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পণ্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ১৯ লাখ ১৭ হাজার ১৯৪ টাকা ভ্যাট পরিশোধ না করার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষায় আরও দেখা গেছে, দুই অর্থবছরে ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৩৪ হাজার ১৭৫ টাকার বিক্রয় তথ্য ভ্যাট রিটার্নে প্রদর্শন করা হয়নি। এর বিপরীতে ৪৬ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬ টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি প্যাকেজিং উপকরণের ক্ষেত্রে ১ লাখ ৩ হাজার ৪৮৩ টাকা কম ভ্যাট পরিশোধের তথ্যও পাওয়া গেছে।

উৎসে কর্তন করা মূসক সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উৎসে মূসক কর্তনকারী স্বত্বা হিসেবে বিভিন্ন সেবা ও ব্যয়ের বিপরীতে কোম্পানিটির মোট কর্তনযোগ্য মূসকের পরিমাণ ছিল ২১ কোটি ১৭ লাখ ৯৭ হাজার ৩০৫ টাকা। এর মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে ৬ কোটি ৯১ লাখ ৪০ হাজার ৬৯ টাকা।

অবশিষ্ট ১৪ কোটি ২৬ লাখ ৫৭ হাজার ২৩৬ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস (সিএ) প্রতিবেদনে দেখানো অন্যান্য আয়ের বিপরীতে ৩ কোটি ২৯ লাখ ৮২ হাজার ৫৯২ টাকার ভ্যাটও পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মোট ১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকার রাজস্ব অনিয়ম

এনবিআরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে স্থানীয় ও আমদানি পর্যায়ে অবৈধ কর রেয়াত গ্রহণ, ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট পরিশোধ না করা, বিক্রির তথ্য গোপন রাখা, উৎসে কর্তন করা মূসক সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া এবং অন্যান্য আয়ের ওপর ভ্যাট ফাঁকিসহ মোট ১৯ কোটি ৭১ লাখ ৮ হাজার ৪৮৯ টাকার রাজস্ব অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ