
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে রেট নির্ধারণ করে কোটি টাকার লেনদেন
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বদলি বানিজ্য এবং ঘুষ গ্রহন থামার কোনো নামই নেই। প্রতিবেদকের তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে বদলি ও পদায়নকে ঘিরে ‘রেট নির্ধারণ’ করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) সফিকুল ইসলাম, হাটহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা (ডেপুটি রেঞ্জার) সাইফুল ইসলামকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয়রা।
দায়িত্ব গ্রহণ ও অভিযোগের শুরু:
ডিএফও সফিকুল ইসলাম তার টাকা, ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তিকে কাজে লাগিয়ে কোটি টাকার বিনিময়ে ডিএফও কায়সারকে সরিয়ে ০৪/০৯/২০২৫ তারিখে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি উপকূলীয় বন বিভাগ, পটুয়াখালীর দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, কোটি টাকার বিনিময়ে তিনি বন বিভাগের নিউক্লিয়াসখ্যাত চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি আখের গোছাতে ব্যস্ত,এমন মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী জুন মাসে তার পিআরএলে যাওয়ার কথা। পিআরএলের পূর্বেই কোটি কোটি টাকার বদলি বানিজ্য এবং মাসিক মাসোহারা গ্রহণের এক বিরল নজির গড়ে যাচ্ছেন ডিএফও সফিক।
পর্দার আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ:
অভিযোগ রয়েছে সফিকুল ইসলাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হলেও চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ পর্দার আড়ালে নিয়ন্ত্রণ করেন হাটহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার সাইফুল ইসলাম। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাইফুলের ইশারা ছাড়া চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে কোনো বদলি হয় না।এই সিন্ডিকেটের আরেক সদস্য হিসেবে উঠে এসেছে প্রধান সহকারী নাম।
‘রেট নির্ধারণ’ করে বদলি:
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে অনেকটাই ওপেন সিক্রেট বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বন প্রহরীদের বদলির জন্য রয়েছে নির্ধারিত রেট। করেরহাট স্টেশন, ধূমঘাট স্টেশন, হাটহাজারী স্টেশন, ফৌজদারহাট স্টেশন ও শহর রেঞ্জে ৫ লাখ টাকা করে, অপেক্ষাকৃত ছোট চেকপোস্টে ৩ লাখ টাকা করে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিট গুলোতেই ১ থেকে ২ লাখ টাকা।অভিযোগ রয়েছে, বদলির ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করা হয় না। রেঞ্জ ও বিট পর্যায়ে জনবলের চাহিদা বিবেচনা না করে টাকার বিনিময়ে চেকপোস্টগুলোতে পদায়ন করা হয়।সফিকুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ৬০ (ষাট) টিরও বেশি অফিস অর্ডার করেছেন আর হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা, মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমনটাই বলেছেন।
সংশ্লিষ্ঠ একাধিক সূত্র থেকে জানা যায় বদলির আদেশের বিষয়ে বদলি ও নিয়োগের সুপারিশ সংক্রান্ত কমিটি থাকলেও ডিএফও সফিকুল ইসলাম কাগজে কলমে সুবিধাজনক সময়ে নামমাত্র মিটিং দেখিয়ে বদলি ও পদায়ন কমিটির অন্যান্য সদস্যদের স্বাক্ষর নিতে বাধ্য করেন। আরও বেশকিছু ভাগ বাটোয়ারার অর্ডার খসড়া হিসাবে প্রধান সহকারী মিজানের টেবিলে রাখা হয়েছে, সফিকুল ইসলাম তার সুবিধাজনক সময়ে প্রকাশ করবেন।সংশ্লিষ্টদের দাবি ডিএফও সফিকুল ইসলাম যেন পিআরএলে যাওয়ার আগে আর যেন কোনো বদলি বানিজ্য করতে না পারে। এর আগেও বিগত সময়ে ডিএফও সফিকুল ইসলাম ও ডেপুটি রেঞ্জার সাইফুল একসাথে চট্টগ্রাম দক্ষিন বন বিভাগে চাকরি করার সময় কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তাছাড়া ডিএফও সফিকুল ইসলাম উপকূলীয় বন বিভাগ,পটুয়াখালীতে দায়িত্বে থাকার সময় সুফল প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে এসেছেন। তার সময়কালে উপকূলীয় বন বিভাগ পটুয়াখালীতে সৃজিত বাগানের বেশির ভাগই প্রায় ফাঁকা বলেই সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভিন্ন স্টেশন,রেঞ্জ এবং বিট থেকে ডিএফওর নামে মাসিক হিসেবে নির্দিষ্টহারে চাঁদা উত্তোলন করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাঠ পর্যায়ের আরেক কর্মকর্তা জানায় মাসোহারা হিসাবে বিভিন্ন চেকপোস্ট, রেঞ্জ ও বিট হতে মাসিক প্রায় ২০ লক্ষ টাকা করে নেন সফিকুল ইসলাম। এর পাশাপাশি প্রতিটি চেকপোস্ট থেকে আলাদাভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
সফিকুল ইসলামের অপকর্মের ম্যানেজারখ্যাত ডেপুটি রেঞ্জার সাইফুলের অধীনে হাটহাজারী রেঞ্জের সর্তা ও শোভনছরি বিটের অধিকাংশ সেগুন বাগান উজাড় করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে যায় একটা বিরাট অংশ চলে আসে ডিএফও সফিকুল ইসলামের পকেটে।
হাটহাজারী রেঞ্জে অন্তত ১০০ টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে, যেখানে সংরক্ষিত বনের চোরাই কাঠ পোড়ানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি গাড়ী লাকড়ীর বিনিময়ে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়, যা রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে পৌঁছায়। ডিএফও সফিকুল ইসলামের পকেটেও মাস শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পৌঁছায় এই বিশাল জ্বালানী পাচার থেকে,এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের থেকে।
এই ধরনের দূর্নীতিবাজ অপরাধপ্রবণ ব্যাক্তিদের জন্যে বন বিভাগের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে হুমকির মুখে পড়লেও এখনো ঊর্ধ্বতন মহলের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ চোখে পড়ছে নাহ।

