শুক্রবার, জুন ৫, ২০২৬

আইনে বিধান থাকলেও ২২ বছরেও গড়ে ওঠেনি দুদকের নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট

দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান, প্রমাণ সংগ্রহ ও তদন্ত শেষে মামলা দায়েরের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়। তবে মামলার চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করে আদালতে কার্যকর প্রসিকিউশনের ওপর। অথচ কমিশন প্রতিষ্ঠার দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আইনে উল্লেখিত নিজস্ব স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট গঠন করতে পারেনি দুদক।

বর্তমানে সংস্থাটির মামলা পরিচালিত হচ্ছে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত প্যানেলভুক্ত আইনজীবীদের মাধ্যমে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই ব্যবস্থা দুদকের মামলাগুলোর কার্যকারিতা ও সাফল্যের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

আইনের বিধান ও বাস্তবতা

দুদক আইনের ৩৩(১) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কমিশনের তদন্ত করা এবং বিশেষ জজ আদালতে বিচারযোগ্য মামলাগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক প্রসিকিউটর নিয়ে কমিশনের অধীনে একটি স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট থাকবে।

একই আইনের ৩৩(২) ধারায় উল্লেখ রয়েছে, নিজস্ব প্রসিকিউটর নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত কমিশন অস্থায়ী ভিত্তিতে আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারবে।

তবে বাস্তবে সেই অস্থায়ী ব্যবস্থাই প্রায় ২২ বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে এবং এখনো স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

দণ্ডের হার নিয়ে প্রশ্ন

দুদকের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিচারিক আদালতে সংস্থাটির দায়ের করা মামলাগুলোর দণ্ডের হার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। দুর্নীতির মতো জটিল অপরাধে দীর্ঘ অনুসন্ধান ও তদন্তের পরও মামলার ফলাফল প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন আইন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তারা।

তাদের মতে, আর্থিক অনিয়ম, সম্পদের উৎস, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানি ট্রেইল এবং জটিল নথি বিশ্লেষণসংক্রান্ত মামলাগুলো পরিচালনার জন্য বিশেষায়িত দক্ষতা প্রয়োজন, যা একটি স্থায়ী ও প্রশিক্ষিত প্রসিকিউশন কাঠামোর মাধ্যমে অধিক কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মঈদুল ইসলাম বলেন, “দুদকের মামলাগুলো সাধারণ ফৌজদারি মামলার মতো নয়। এখানে আর্থিক লেনদেন, নথি বিশ্লেষণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো বিষয় থাকে। এ কারণেই আইনে স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিটের কথা বলা হয়েছিল। নিজস্ব ইউনিট থাকলে তাদের ওপর কমিশনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকত এবং তারা কেবল দুদকের মামলাই পরিচালনা করতেন।”

তিনি আরও বলেন, “আইনে অস্থায়ী ব্যবস্থা রাখার উদ্দেশ্য ছিল স্থায়ী ইউনিট গঠনের আগ পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তী সমাধান নিশ্চিত করা। কিন্তু দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো কমিশন এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।”

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, বর্তমান ব্যবস্থায় প্যানেলভুক্ত আইনজীবী নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করার সুযোগ থাকে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেমন সরকারি কৌঁসুলিদের (পিপি) পরিবর্তন ঘটে, তেমনি দুদকের ক্ষেত্রেও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ শোনা যায়। ফলে একটি পেশাদার, স্বাধীন ও বিশেষায়িত প্রসিকিউশন কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

একাধিক সাবেক কর্মকর্তা ও আইনজীবীর মতে, অস্থায়ী ও খণ্ডকালীন আইনজীবী ব্যবস্থায় মামলার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ, ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে দুর্নীতির মামলার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ দক্ষতাও পর্যাপ্তভাবে বিকশিত হয় না।

টিআইবির পর্যবেক্ষণ

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুদক আইনে নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কমিশন এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেনি। নতুন সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে আশা করছি।”

তিনি আরও বলেন, “দুর্নীতির মামলার প্রকৃতি জটিল হওয়ায় বিশেষ দক্ষতা, ধারাবাহিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট না থাকলে মামলার কার্যকর পরিচালনা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই প্যানেল আইনজীবীদের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম চলমান রাখার পাশাপাশি স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”

সংস্কারের দাবি

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে আরও কার্যকর করতে তদন্ত ও অনুসন্ধানের পাশাপাশি আদালতে মামলা পরিচালনার কাঠামোকেও শক্তিশালী করতে হবে। তাদের মতে, আইনে থাকা স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট বাস্তবায়ন করা গেলে দুদকের মামলা পরিচালনায় দক্ষতা, জবাবদিহি এবং সাফল্যের হার বৃদ্ধি পেতে পারে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ