বুধবার, জুন ৩, ২০২৬

মসলা বিক্রেতার ছেলের শত বিঘা জমি ও কোটি টাকার সম্পদ: শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য

নাটোরের লালপুর উপজেলার এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে মাত্র এক দশকের চাকরি জীবনে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম (কাঁকন)—এমন অভিযোগ উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। তার বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন, চোরাচালান চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মসলা বিক্রেতার পরিবার থেকে সরকারি চাকরি

অনুসন্ধানে জানা যায়, শহিদুল ইসলাম কাঁকন নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার শ্রীরামগাতি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মহির উদ্দিনের একমাত্র ছেলে। স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মহির উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন হাট-বাজারে ধনিয়া, জিরা, আদা, হলুদ ও মরিচসহ বিভিন্ন মসলা ফেরি করে বিক্রি করতেন। সীমিত আয়ের মধ্যেই তিনি দুই মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে লেখাপড়ার সুযোগ করে দেন।

প্রায় ১২ থেকে ১৩ বছর আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন শহিদুল ইসলাম। স্থানীয়দের দাবি, চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তার আর্থিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। পদমর্যাদায় তুলনামূলক নিচের স্তরের কর্মকর্তা হলেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

গ্রামে শত বিঘা জমি, ডেইরি ফার্ম ও কোটি টাকার মেহগনি বাগান

শ্রীরামগাতি গ্রামে সরেজমিন অনুসন্ধানে শহিদুল ইসলাম ও তার পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে এলাকায় প্রায় শত বিঘা জমি ক্রয় করা হয়েছে।

এছাড়া গড়ে তোলা হয়েছে একটি বড় আকারের ডেইরি ফার্ম। গ্রামের বাড়ির পাশেই জমিসহ প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি বিশাল মেহগনি বাগান কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে। পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বিলাসবহুল বাড়ি।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, রাজধানী ঢাকাতেও শহিদুল ইসলামের একাধিক ফ্ল্যাট ও ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান এখনও চলমান রয়েছে।

চোরাচালান চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বিভিন্ন স্থল ও বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকালে আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের সঙ্গে শহিদুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে চোরাচালান পণ্য নিরাপদে পারাপারে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রামের এক প্রবীণ ব্যক্তি দাবি করেন, এক পর্যায়ে প্রায় ১০ কেজি স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় শহিদুল ইসলাম ধরা পড়েছিলেন। তবে বিষয়টি পরবর্তীতে প্রভাব খাটিয়ে নিষ্পত্তি করা হয় বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে।

ওই ব্যক্তি আরও দাবি করেন, ঘটনাটির পর শহিদুল ইসলাম নিজেই এলাকায় এসে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্নজনের কাছে দম্ভোক্তি করতেন। তবে এ ধরনের বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেষ্টা

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শহিদুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে রাজশাহীতে তার বর্তমান কর্মস্থলে গিয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে নিজের পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেন বলে অনুসন্ধানী দলের দাবি।

একপর্যায়ে তার সম্পদ ও সম্পদের উৎস সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ও ছবি দেখানো হলে তিনি অবৈধ উপার্জনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এগুলো আমার সম্পদ নয়, আমার পরিবারের সম্পত্তি।”

তবে পরিবারের অতীত আর্থিক অবস্থা এবং একজন সরকারি কর্মকর্তার পরিবারের পক্ষে স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রতিবেদন প্রকাশ ঠেকাতে চাপের অভিযোগ

অনুসন্ধানী দলের দাবি, রাজশাহীতে শহিদুল ইসলামের কার্যালয় থেকে বের হওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই ঢাকা থেকে একাধিক প্রভাবশালী সাংবাদিক নেতার মাধ্যমে প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার জন্য বিভিন্ন ধরনের তদবির ও চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়।

তবে অনুসন্ধানী দল জানিয়েছে, প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

তদন্তের দাবি

স্থানীয় সচেতন মহল ও দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ