
দিনে ব্যবসা, রাতে গুলির আতঙ্ক—চট্টগ্রামের বন্দরনগরীতে এখন এমনই এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের কাছে কোটি টাকার চাঁদা দাবি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই হামলা চালানো হচ্ছে, আর পুলিশের উপস্থিতিও অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ফজরের নামাজের পর চট্টগ্রামের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়ির সামনে মুখোশধারী চারজন সশস্ত্র ব্যক্তি অবস্থান নেয়। তাদের হাতে পিস্তল, স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র, চীনা রাইফেল ও শটগান ছিল বলে জানা যায়। এরপর তারা একযোগে গুলিবর্ষণ করে। ওই সময় বাড়িটিতে পুলিশ পাহারায় পাঁচজন সদস্য থাকলেও হামলাকারীদের থামানো সম্ভব হয়নি। এটি একই বাড়িতে চাঁদার দাবিতে দ্বিতীয় দফা হামলা বলে জানা গেছে।
এর আগে ২ জানুয়ারি একই বাড়িতে প্রথম হামলার ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’ প্রথমে ১০ কোটি টাকা এবং পরে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি দিয়ে বলা হয়, “অপেক্ষা করো এবং দেখো”—এরপরই হামলার ঘটনা ঘটে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদেশে অবস্থান করে মোবাইল ফোনে হুমকি, হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো এবং স্থানীয় মাধ্যমের সহায়তায় নির্মাণাধীন ভবনের ভিডিও সংগ্রহ করে লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমে একটি সংগঠিত চক্র কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যে জানা গেছে।
অপরাধ জগতের আলোচিত নাম হিসেবে উঠে এসেছে সাজ্জাদ আলী খান। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করলেও চট্টগ্রামের অন্তত পাঁচটি থানার অপরাধ কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন। তার নির্দেশে বিভিন্ন এলাকায় ফোন ও বার্তার মাধ্যমে চাঁদা দাবি করা হয় বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বায়েজিদ বোস্তামী, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, হাটহাজারী ও চকবাজার এলাকায় তার একাধিক স্থানীয় সহযোগী সক্রিয় রয়েছে। এসব এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন, ইটভাটা ও পরিবহন খাতকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত দেড় বছরে একাধিক সহিংস ঘটনারও তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট হাটহাজারীতে ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমের বাড়িতে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে এতে বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানার কালারপুর এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনে অস্ত্রধারী এক ব্যক্তি প্রকাশ্যে প্রবেশ করে গুলি চালায় বলে জানা যায়। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাঁচলাইশ এলাকায় আরেকটি নির্মাণাধীন ভবনে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির ঘটনায় হামলার অভিযোগ ওঠে, যেখানে একই চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে তদন্ত সূত্র দাবি করে।
চট্টগ্রামের রাউজান থেকে বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে এই চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক। অভিযোগ অনুযায়ী, ইটভাটা, পরিবহন এবং নির্মাণ খাত থেকে নিয়মিতভাবে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে দৈনিক কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায়ের অভিযোগও বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে।
অপরাধ সংশ্লিষ্টদের তালিকায় আরও রয়েছে সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ, যিনি হত্যা ও অস্ত্র মামলাসহ একাধিক মামলার পলাতক আসামি হিসেবে পরিচিত। এছাড়া কথিত কিলিং স্কোয়াডের সঙ্গে যুক্ত মোহাম্মদ রায়হান-এর বিরুদ্ধেও একাধিক হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
অপরদিকে হাবিব খান নামের আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও বিদেশে বসে স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী জানিয়েছেন, চট্টগ্রামকে নিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। পুলিশ পাহারার মধ্যেও হামলার ঘটনা ঘটায় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অনেকেই মামলা করতে ভয় পাচ্ছেন পাল্টা হামলার আশঙ্কায়। ব্যবসায়ী মহলের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে এবং উদ্যোক্তারা আরও নিরুৎসাহিত হবেন।

