বুধবার, মে ১৩, ২০২৬

পিএসসির সুপারিশ ছাড়াই চাকরি, ২৯-৩১তম বিসিএসে ৯৫ ‘ভু’য়া ক্যাডার’ নিয়োগের অ’ভিযোগ

সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ ছাড়াই জালিয়াতির মাধ্যমে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন অন্তত ৯৫ জন কর্মকর্তা—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২৯, ৩০ ও ৩১তম বিসিএসে নিয়ম ভেঙে এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা ব্যবহার করে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়।

অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তদের বড় একটি অংশ প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পান। অনেকেই আবেদনের সময় মুক্তিযোদ্ধা কোটা উল্লেখ না করলেও পরবর্তীতে জাল সনদ তৈরি করে কোটার সুবিধা নেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

যেভাবে তৈরি হয় ‘ভুয়া ক্যাডার’ নিয়োগের পথ

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০১২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ‘Age, Qualification and Examination for Direct Recruitment Rules-1982’ সংশোধন করে একটি বিধিবদ্ধ প্রবিধান আদেশ (এসআরও) জারি করে। ওই আদেশে বলা হয়, পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত কেউ মেডিকেলে অনুপস্থিত থাকলে শূন্য পদে মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া যাবে।

অভিযোগ রয়েছে, এই বিধানকে পেছনের তারিখ থেকে কার্যকর দেখিয়ে ২৮তম বিসিএসের পরবর্তী ব্যাচগুলোতে পছন্দের প্রার্থীদের ক্যাডার পদে বসানো হয়। এমনকি যাদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ ছিল না, তাদের নামেও জাল সনদ তৈরি করা হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের নির্দেশনায় পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়। এজন্য প্রশাসনের ভেতরে ২৯, ৩০ ও ৩১তম বিসিএসকে অনেকে “এইচ টি ইমাম বিসিএস” বলেও উল্লেখ করেন।

তিন বিসিএসে অনিয়মের চিত্র

দুদকের তথ্য অনুযায়ী—

  • ২৯তম বিসিএসে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ পান ২৯ জন।
  • ৩০তম বিসিএসে নিয়োগ পান ৩১ জন।
  • ৩১তম বিসিএসে একইভাবে ক্যাডার হন ৩৫ জন।

এদের মধ্যে অন্তত ৬৮ জনের বিস্তারিত তথ্য ও প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারে অনিয়মের অভিযোগ

অভিযুক্তদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারে সাজিয়া আফরীন, আসমাউল হুসনা লিজা, নাসরীন পারভীন, সুলতানা রাজিয়া ও মমতাজ বেগমসহ একাধিক কর্মকর্তার নাম এসেছে। পুলিশ ক্যাডারে আছাদুজ্জামান ও মাহফুজা আক্তার শিমুলের নামও রয়েছে অভিযোগের তালিকায়।

এছাড়া শুল্ক ও আবগারি, কর, ইকোনমিক, শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডারেও নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে।

দুদকের মামলায় ৬ কর্মকর্তা

দুদক ইতোমধ্যে ছয়জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তারা হলেন—

  • রকিবুর রহমান খান
  • মো. তোফাজ্জল হোসেন
  • নাহিদা বারিক
  • খোরশেদ আলম
  • হালিমা খাতুন
  • মো. মিল্টন আলী বিশ্বাস

দুদকের অভিযোগ, তারা আবেদনের সময় কোনো কোটার উল্লেখ না করলেও পরবর্তীতে জাল মুক্তিযোদ্ধা সনদের মাধ্যমে ক্যাডার পদে নিয়োগ পান।

এই ঘটনায় পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান, সদস্য, সচিব, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ আরও ১৫ জনের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। পাশাপাশি শতাধিক কর্মকর্তার বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

অভিযুক্তদের বক্তব্য

অভিযুক্তদের একজন মমতাজ বেগম অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তাদের নিয়োগ মেধার ভিত্তিতেই হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, অনেকেই আবেদনের সময় মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবহার না করলেও পরে সেই সুবিধা পেয়েছেন।

দুদকের সতর্কবার্তা

দুদক কমিশনার (তদন্ত) মিয়া আলী আকবর আজিজি বলেন,

“মুক্তিযোদ্ধা কোটার অপব্যবহারের মাধ্যমে যারা অবৈধভাবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বিশেষজ্ঞদের ক্ষোভ

সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, “যারা নিজেরাই জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরিতে আসেন, তাদের হাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব থাকা অত্যন্ত ভয়ংকর।”

অন্যদিকে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই ঘটনাকে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার আখ্যা দিয়ে বলেন, “এ ধরনের অবৈধ নিয়োগ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি। জড়িত সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।”

@durnitirdiary

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ