বৃহস্পতিবার, জুন ১৮, ২০২৬

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অনিয়ম-দুর্নীতি ও জনভোগান্তি চরমে

এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ এশিয়ার উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ হিসেবে পরিচিত ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ভুক্তভোগী মানুষের দীর্ঘদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের প্রত্যাশা নিয়ে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময় গড়িয়ে গেলেও অগ্রগতি একেবারেই অসন্তোষজনক।

কাজের ধীরগতি, চরম অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগে মহাসড়কের প্রায় ২১৩ কিলোমিটার অংশ এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা, ঝরে যাচ্ছে প্রাণ।

প্রকল্পের কাজ একাধিক প্যাকেজে ভাগ করে দেওয়া হলেও অধিকাংশ স্থানে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। নরসিংদী, ভৈরব ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল অংশে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার একপাশে মাসের পর মাস মাটি খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। সার্ভিস লেনের কাজ অর্ধেক করে ফেলে রাখায় বর্ষা মৌসুমে কাদা আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলার রাজ্যে পরিণত হয়েছে পুরো মহাসড়ক।

কোনো কোনো প্যাকেজে গত এক বছরে কাজের অগ্রগতি মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সরু হয়ে যাওয়া রাস্তায় প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগেই থাকছে। সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। তারা অভিযোগ করে জানান, রাস্তার বেজ নির্মাণে নির্ধারিত মানের পরিবর্তে নিম্নমানের ইটের খোয়া ও স্থানীয় বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্মাণাধীন এলাকায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী কিংবা সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)-এর কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকায় ঠিকাদাররা নিজেদের ইচ্ছেমতো প্রাক্কলন না মেনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রকল্পের ধীরগতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে জমি অধিগ্রহণ জটিলতা সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রকৃত জমির মালিক এখনো ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। বরং দালাল চক্রের মাধ্যমে ভুয়া স্থাপনা দেখিয়ে সরকারি কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের পাঁয়তারা চলছে বলে অনেকেই ইনকিলাবকে জানিয়েছেন।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে ৬ লেনে (মূল ৪ লেন ও দুই পাশে ২ লেন সার্ভিস রোড) উন্নীত করার এই প্রকল্পের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ আশানুরূপ গতিতে এগোচ্ছে না। অনেক এলাকায় জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে কাজ পুরোপুরি থমকে আছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ), ভূমি মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সেবা প্রদানকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে বহু স্থানে কাজ আটকে আছে বলে জানা গেছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশের মতো।

যদিও প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল, তবে সংশ্লিষ্ট এডিশনাল ম্যানেজার অখিল কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, কাজের বর্তমান অগ্রগতি বিবেচনায় প্রকল্প সমাপ্ত হতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে।

এদিকে মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল থাকলেও খানা-খন্দে গাড়ির গতি রোধ করে ডাকাতির ঘটনাও অহরহ ঘটছে। পাশাপাশি দ্রুতগতি, বেপরোয়া চলাচল ও ওভারটেকিংয়ের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। চলতি সপ্তাহেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। এতে অন্তত ২০ জন যাত্রী গুরুতর আহত হন।

উল্লেখ্য, কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত ২০৯ কিলোমিটার সড়কে ৬৬টি সেতু ও ৩০৫টি কালভার্ট নির্মাণসহ প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। ফলে প্রকল্প ব্যয়ও পরিবর্তিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের কাজ দীর্ঘদিন ধরে ধীরগতিতে চললেও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এ নিয়ে তেমন কোনো তৎপরতা বা উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এতে দিন দিন জনদুর্ভোগ বাড়লেও কার্যকর সমাধানের কোনো লক্ষণ নেই।

@dailyinqilab

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ