
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের (ডিডিএম) প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ লেনদেনের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) রেজওয়ানুর রহমান। নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ও টেন্ডারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটি কথিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনৈতিক লেনদেন এবং কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অভিযোগের বিষয়ে মো. জাহাঙ্গীর আলম নামে এক ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এতে রেজওয়ানুর রহমানের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, উচ্চ আদালতের একটি আদেশের ব্যাখ্যা দেখিয়ে ২২৮ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিজনের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এভাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তবে আদালতের আদেশে উপসহকারী প্রকৌশলীর সমমানের পদে নিয়োগের কথা বলা হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজস্ব খাতে উপসহকারী প্রকৌশলীর পদে ৭৩ জনকে নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে ডিজি রেজওয়ানুর রহমানের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের আর্থিক লেনদেন ও নিয়োগপ্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিরীহ ব্যক্তি ও বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। একই সময়ে অধিদপ্তরে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রকৃত ক্ষতির তুলনায় বাড়িয়ে দেখিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অগ্নিকাণ্ডে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা হলেও তা বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা দেখানো হয়েছিল।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন এবং তাদের মাধ্যমে অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা দাবি করেছেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে পদায়ন ও নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রেজওয়ানুর রহমান ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২০ জুন তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর থেকেই আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ ও কথিতভাবে দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সিলেটের জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হলেও তাকে এখনো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে রাখা হয়েছে। তার মাধ্যমে বদলি, পদোন্নতি, টেন্ডার, কেনাকাটা ও প্রশাসনিক বিভিন্ন কার্যক্রমে অনৈতিক লেনদেন পরিচালনা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া অধিদপ্তরের বড় বড় প্রকল্পের টেন্ডার, ত্রাণসংক্রান্ত কার্যক্রম এবং বিভিন্ন কেনাকাটায় আত্মীয়-স্বজনদের ব্যবসায়িকভাবে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। একই সঙ্গে সরকারি কাজে প্রভাব বিস্তার এবং দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সময় ভ্রমণসহ আরও কিছু অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা। এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে ২২৮ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে সরাসরি পিআইও পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগটি সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তার ভাষ্য, দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগের এখতিয়ার অধিদপ্তরের নেই। এ ধরনের নিয়োগ সরাসরি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) অথবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে এবং অধিদপ্তর পরবর্তীতে তা বাস্তবায়ন করে। ফলে এ ক্ষেত্রে মহাপরিচালকের ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই।
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিয়োগসংক্রান্ত নথি, আদালতের আদেশ, অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, পদায়ন ও টেন্ডারপ্রক্রিয়া এবং অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

