রবিবার, জুলাই ৫, ২০২৬

চার বছরেও শেষ হয়নি ১০ কোটি টাকার পানি প্রকল্প, নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত আড়াই হাজার পরিবার

মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলায় বাস্তবায়নাধীন ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি’ শীর্ষক প্রায় ১০ কোটি টাকার প্রকল্প চার বছরেও শেষ হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় দুই উপজেলার প্রায় আড়াই হাজার পরিবার এখনো নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তদারকির অভাব ও অনিয়মের কারণে প্রকল্পটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লিবার্টি ট্রেডার্স (জেবি) নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটির প্রায় ১০ কোটি টাকার কার্যাদেশ পায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় একাধিকবার সময় বাড়ানো হলেও প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক বছর ধরে কোনো কাজ না করে কার্যত উধাও রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি কাজটি পায় এবং এর বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না করেই বিপুল পরিমাণ বিল উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানা যায়, ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি’ প্রকল্পটি ২০২১ সালে শুরু হয় এবং ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) যৌথ বাস্তবায়নে পরিচালিত এ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবি। দেশের ৩০টি জেলার ৯৮টি উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় পাইপলাইনভিত্তিক নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রতিটি কমিউনিটি প্রকল্পের মাধ্যমে ৩০ থেকে ৪০টি দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধাও নিশ্চিত করার পরিকল্পনা ছিল।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে মোট ৭৬টি পানি সরবরাহ লাইন স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৩৮টির বিপরীতে ২২টিতে আংশিক কাজ হয়েছে। তবে রাজনগর উপজেলার ৩৮টি প্রকল্পের একটিতেও কার্যকরভাবে কাজ শেষ হয়নি। ফলে অসমাপ্ত প্রকল্প শেষ করতে নতুন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরেজমিনে রাজনগরের বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি পাওয়া যায়নি। অনেক স্থানীয় বাসিন্দাই এমন কোনো প্রকল্পের বিষয়ে অবগত নন। অন্যদিকে সদর উপজেলার চাঁদনিঘাট ইউনিয়নের কির্তার মহল এলাকায় দেখা গেছে, নিম্নমানের আংশিক কাজ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটি হস্তান্তর না করেই চলে যায়। পরে উপকারভোগীরাই নিজেদের অর্থ ব্যয়ে মোটর, পাইপ ও বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করে পানি সরবরাহ চালু করেন।

কির্তার মহলের বাসিন্দা সুমন মালাকার বলেন, “প্রায় এক বছর আগে আমরা নিজেদের প্রায় ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ে পানির লাইন সচল করেছি। প্রায় ৩০টি পরিবার এই লাইন থেকে পানি ব্যবহার করছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোটর, পাইপ, বিদ্যুৎ মিটার কিংবা ট্যাংকে ওঠার সিঁড়ি—কিছুই দেয়নি। তারা যে পাইপ বসিয়েছিল, সেটিও কয়েক দিনের মধ্যে ফেটে যায়। খুবই নিম্নমানের কাজ হয়েছে।”

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামান কুমিল্লায় কর্মরত থাকাকালে পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে কমিশনের বিনিময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ পাইয়ে দেন। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক শাহিন আলম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন কর্মরত কর্মকর্তা হলেও অন্য প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করে ঠিকাদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। একই অধিদপ্তরে চাকরিরত অবস্থায় কীভাবে তিনি এত বড় প্রকল্পের কাজ পেয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, প্রকল্পের অগ্রগতি, দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংবা কত টাকা বিল পরিশোধ হয়েছে—এসব বিষয়ে জেলা ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তাই স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের কার্যালয়ে গেলেও তিনি সাক্ষাৎ করেননি। পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তা পাঠিয়েও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, শাহিন আলমই প্রকৃতপক্ষে কাজটি পরিচালনা করছিলেন। তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে চাকরির পাশাপাশি অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে ঠিকাদারি কার্যক্রম পরিচালনা করেন বলেও তারা দাবি করেন।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক রমিজ মিয়া বলেন, “এ কাজ আমার নয়। প্রকৃত দায়িত্বে ছিলেন শাহিন নামে একজন, যিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে চাকরি করেন। একসঙ্গে চাকরি ও ঠিকাদারি করা সম্ভব নয় বলে আমি কিছুদিন তদারকি করেছি। আমি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রায় ৯০ লাখ টাকার বিল উত্তোলন হয়েছিল। পরে আর কত টাকা তোলা হয়েছে, তা আমার জানা নেই। অফিসের নিয়ম অনুযায়ী কাজ পেতে হলে অনেককেই খুশি করতে হয়।”

তবে এ বিষয়ে শাহিন আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মুঠোফোন বন্ধ থাকায় যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রাক্কলনিক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “কাজ একেবারেই হয়নি, বিষয়টি এমন নয়। কিছু কাজ হয়েছে। অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হবে।”

জেলা প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও জেলা প্রশাসকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদার জানান, মৌলভীবাজারের দুটি উপজেলার কাজ সম্পন্ন করতে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হবে। তিনি বলেন, “যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ ফেলে চলে গেছে, তারা শুধু মৌলভীবাজার নয়, আরও চারটি স্থানের কাজও অসমাপ্ত রেখে উধাও হয়েছে।”

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মরত কর্মকর্তা শাহিন আলম কীভাবে প্রকল্পের কাজ পেয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প পরিচালক বলেন, “তিনি নিজের লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজ পাননি। অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজটি পেয়েছেন।”

নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, “এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে পারব না। তবে প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়েছে।”

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ