শনিবার, জুলাই ৪, ২০২৬

বিপিসির সাবেক পিএস আহম্মদুল্লাহর বি’রুদ্ধে শতকোটি টাকার সম্পদ, কমিশন বাণিজ্য ও ক্ষমতার অ’প’ব্যবহারের অ’ভিযোগ

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উপব্যবস্থাপক ও চেয়ারম্যানের সাবেক একান্ত সচিব (পিএস) মো. আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, কমিশন বাণিজ্য, নিয়োগে অনিয়ম এবং বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ শতকোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিপিসির গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন ঠিকাদার, জ্বালানি ব্যবসায়ী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা আদায় করতেন। একই সঙ্গে নিজের নামের পরিবর্তে স্ত্রী, শ্বশুর ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করে প্রকৃত মালিকানা আড়াল করার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে এক হাজার ১৬০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুরে আরেকটি ফ্ল্যাট এবং আদাবরে একটি প্লট রয়েছে আহম্মদুল্লাহর পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। এছাড়া কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথীর নামে সাড়ে তিন কাঠার একটি প্লট কেনা হয়, যেখানে বর্তমানে আটতলা ভবনের ছাদ ঢালাই পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দলিলে জমির মূল্য ৩০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা উল্লেখ করা হলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমান বাজারমূল্য তার চেয়ে বহু গুণ বেশি।

এছাড়া ঝালকাঠী সদর উপজেলার দিবাকরকাঠী গ্রামে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি, প্রায় ১০ একরের বেশি জমি, বরিশাল শহরে একটি ফ্ল্যাট এবং উজিরপুর এলাকায় আরও জমি রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পদের বড় অংশই স্ত্রী, মা-বাবা ও শ্বশুরের নামে নিবন্ধন করা হয়েছে, যাতে সম্পদের প্রকৃত উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আইনি জটিলতা এড়ানো যায়।

আহ্ম্মদুল্লাহর স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথী কেরানীগঞ্জের প্লটের মালিকানা স্বীকার করে দাবি করেন, সেখানে ভবন নির্মাণে ব্যাংক ঋণ নেওয়া হয়েছে। তবে সম্পদের উৎস ও বিনিয়োগের পরিমাণ নিয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আহম্মদুল্লাহর স্ত্রী ব্যক্তিগত ব্যবহারের একটি গাড়িতে সরকারি লোগো ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে আহম্মদুল্লাহ দীর্ঘদিন বিপিসির চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের জন্য বরাদ্দ সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, রাজধানীর পল্লবীর বাসভবনে নিয়মিত বিভিন্ন ব্যক্তি উপহারসামগ্রী নিয়ে যেতেন, যা এলাকাবাসীর মধ্যেও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ফাইল আটকে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

বিপিসির অধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েল, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস ব্লেন্ডার্স, এলপি গ্যাস, পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েলসহ আটটি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ক্রয়, বিল ও প্রশাসনিক ফাইল চেয়ারম্যানের অনুমোদনের আগে আহম্মদুল্লাহর ডেস্কে যেত।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ফাইল আটকে রেখে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কমিশন আদায় করতেন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি জাহাজে জ্বালানি সরবরাহকারী (বাংকার) ডিলারদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

একাধিক বেসরকারি রিফাইনারি—পারটেক্স পেট্রো, পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল, অ্যাকোয়া রিফাইনারি এবং বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানির শত শত কোটি টাকার বিল দ্রুত অনুমোদনের বিনিময়েও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করলেও তা দ্রুত ছাড় করতে কমিশন দিতে হতো।

এছাড়া বিটুমিন বিতরণ, বিদেশি জাহাজের এলসি পেমেন্ট এবং ফিলিং স্টেশনের অনুমোদনের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইলেও অর্থের বিনিময়ে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মাদারীপুরের শিবচরে একটি ফিলিং স্টেশনের অনুমোদনের ফাইল আটকে রেখে প্রায় ছয় লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল।

নিয়োগ ও পদোন্নতিতে প্রভাব

২০১৯ সালে বিপিসিতে সরাসরি ষষ্ঠ গ্রেডে যোগদান করা আহম্মদুল্লাহ পরবর্তীতে চেয়ারম্যানের পিএস হিসেবে দায়িত্ব পান। যদিও বিপিসির বিধিমালা অনুযায়ী পিএস পদটি সহকারী ব্যবস্থাপক বা নবম গ্রেডের সমমানের, তবুও তিনি উপব্যবস্থাপক পদে থেকেই টানা সাড়ে ছয় বছর ওই পদে বহাল ছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, এই সময়ে তিনি বরিশাল অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক লোককে বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তোলেন। বিপিসির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, রেস্ট হাউস এবং চেয়ারম্যানের দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে তার নিজ অঞ্চলের লোকজন নিয়োগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে।

বদলির আদেশ বাতিল

২০২১ সালে নতুন চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ দায়িত্ব নেওয়ার পর আহম্মদুল্লাহকে চট্টগ্রামে বদলির আদেশ দেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের চাপে মাত্র এক দিনের মধ্যেই সেই আদেশ প্রত্যাহার করা হয় এবং তিনি পুনরায় পিএস পদে বহাল হন। একই সময়ে তার কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় ঢাকা রেস্ট হাউসের ইনচার্জ মো. শফিউল ইসলাম চাকরি হারান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে আমানতের অভিযোগ

বিপিসির সাবেক পিএস কে এম রিয়াজ রহমান গত ১ মার্চ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে দেওয়া এক আবেদনে অভিযোগ করেন, আহম্মদুল্লাহ ব্যক্তিগত সুবিধার বিনিময়ে বিভিন্ন ব্যাংকে স্বজনদের চাকরির ব্যবস্থা করতেন এবং সেই ব্যাংকগুলোতেই বিপিসির এফডিআর ও এসএনডি হিসাব খুলতে প্রভাব বিস্তার করতেন। তার দায়িত্বকালে বিপিসির উল্লেখযোগ্য অঙ্কের আমানত তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

একই অভিযোগে নিয়োগ বাণিজ্য, ডিপো ইনচার্জদের বদলির হুমকি দিয়ে মাসোহারা আদায়, তদন্ত প্রতিবেদনে জালিয়াতি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনৈতিক প্রভাব খাটানোর বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে।

বর্তমান অবস্থান

গত ১৩ মে বিপিসির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান আহম্মদুল্লাহকে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে সংযুক্ত করেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তিনি এখনও পুরোনো প্রভাববলয়ের মাধ্যমে আবারও চেয়ারম্যানের পিএস পদে ফিরে আসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিপিসির বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাননি এবং দুদকের পক্ষ থেকেও কোনো চিঠি আসেনি। বিভিন্ন ব্যাংকে আমানত ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য জানতে চাইলে তিনি তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরামর্শ দেন।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে অভিযুক্ত মো. আহম্মদুল্লাহর মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তারও কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বিপিসির মতো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার অপব্যবহার, কমিশন বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো অভিযোগগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সম্পদের উৎস, সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ