
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল ও নাসিরনগর উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ না করেই প্রায় ১২ কোটি টাকার সরকারি অর্থ বিলের মাধ্যমে উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক আর্থিক প্রতিবেদনে এই অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। অভিযোগের তীর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম এবং সংশ্লিষ্ট দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রস্তুত করা এলজিইডির আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের তথ্য উঠে আসে। পরে চলতি বছরের ২৮ মে সরাইলের বাসিন্দা মো. জুয়েল হোসেন পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩ (আইআরআইডিপি-৩)’ এর আওতায় সরাইলে দুটি এবং নাসিরনগরে একটি প্যাকেজে মোট ১৮ কোটি ৮৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকার কাজের চুক্তি হয়। এসব প্রকল্পে ঠিকাদারদের অনুকূলে ১৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হলেও এলজিইডির নিজস্ব প্রতিবেদনে দেখা যায়, এর মধ্যে অন্তত ১১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা কোনো কাজ ছাড়াই পরিশোধ করা হয়েছে।
পরমানন্দপুর-ভুইশর সড়কে কোটি টাকার অনিয়ম
সরাইল উপজেলার পরমানন্দপুর-ভুইশর বাজার সড়ক উন্নয়ন ও বক্স কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পে চুক্তিমূল্য ছিল ৮ কোটি ৬৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বিপরীতে ৭ কোটি ৭৮ লাখ ১৩ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হলেও মাঠ পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্যালাসাইডিং ওয়াল নির্মাণ খাতে ২ কোটি ৭৫ লাখ ৬৯ হাজার টাকার বিল পরিশোধ হলেও বাস্তবে কাজ হয়েছে মাত্র ৮২ লাখ টাকার। একইভাবে সিসি ব্লক, বালু ভরাট, মাটির কাজ, ব্রিক সোলিং, এইচবিবি, বক্স কাটিং এবং শ্রমিক মজুরি খাতে কোটি কোটি টাকার বিল তোলা হলেও কাজের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী সড়কের ঢালে ১১ সারি সিসি ব্লক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে পাওয়া গেছে মাত্র ৬ থেকে ৭ সারি। ফলে বিলের বিপরীতে কাজের পরিমাণ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ফাতাপুর-বাড়ীচেরা সড়কেও একই চিত্র
সরাইলের ফাতাপুর-বাড়ীচেরা সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পেও একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। ৬ কোটি ১২ লাখ টাকার চুক্তির বিপরীতে প্রায় ৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হলেও বিভিন্ন খাতে কোটি টাকার কাজ কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্যালাসাইডিং, সিসি ব্লক, মাটির কাজ, বালু ভরাট, ব্রিক সোলিং ও নদীতীর সংরক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে সেই কাজের পূর্ণাঙ্গ অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
নাসিরনগরেও অভিযোগ
নাসিরনগর উপজেলার ভোলাকুট ইউনিয়ন থেকে রামপুর বাজার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এই প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোহাম্মদ ইউনুছ অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রা.) লিমিটেডকে তিন দফায় ২ কোটি ৪২ লাখ ১৩ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। তবে তদন্তকালীন সময়ে এলাকাটি পানিতে প্লাবিত থাকায় কাজের প্রকৃত অগ্রগতি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কাজ শেষের আগেই ফেরত জামানত
অনিয়মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই তিনটি প্যাকেজের ঠিকাদারদের পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বাবদ জমা রাখা মোট ২ কোটি ৫৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকার জামানত ফেরত দেওয়া হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কাজ সম্পন্ন হওয়ার এক বছর পর এই জামানত ফেরত দেওয়ার কথা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিল আগেই পেয়ে যাওয়ায় অনেক ঠিকাদার কাজ সম্পন্ন করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে একাধিক প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং বর্তমানে বিকল্প উপায়ে কাজ শেষ করার চিন্তা করছে কর্তৃপক্ষ।
অভিযুক্ত কর্মকর্তারা বহাল
অভিযোগে নাম আসা তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান বর্তমানে গাজীপুরে কর্মরত রয়েছেন। অন্যদিকে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বর্তমানে এলজিইডি সদর দপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যেখানে আংশিক কাজ হয়েছে, সেখানেও নকশা অনুযায়ী নির্মাণ না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অথচ কাগজে-কলমে ব্যয় দেখানো হয়েছে কোটি কোটি টাকা।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
অভিযোগ প্রসঙ্গে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান বলেন, “ওই বিষয়টির সমাধান হয়ে গেছে। বর্তমানে কাজ চলছে।”
তবে কাজ শেষ হওয়ার আগেই জামানতের টাকা ফেরত দেওয়া এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. বেলাল হোসেন এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলজিইডির বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলীল জানান, অভিযোগ তদন্তে চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অসমাপ্ত কাজ কীভাবে শেষ করা হবে সে বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “বিষয়টি একাধিক স্তরে তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

