বুধবার, মে ২৭, ২০২৬

গাসিকে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও ফাইল বাণিজ্যের অ’ভিযোগ, আলোচনায় সুদীপ বসাক-আমজাদ সি’ন্ডিকেট

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন (গাসিক) জুড়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ফাইল বাণিজ্য এবং বিভিন্ন বিভাগের কাজে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গাসিকের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাক এবং যান্ত্রিক বিভাগের কর্মচারী আমজাদ হোসেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, যান্ত্রিক বিভাগের বাইরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমেও প্রভাব বিস্তার করে টেন্ডার প্রক্রিয়া ও ফাইল অনুমোদনে হস্তক্ষেপ করছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুদীপ বসাক একসময় মাস্টাররোল কর্মচারী হিসেবে চাকরি শুরু করেন। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি যান্ত্রিক, বিদ্যুৎ ও পানি বিভাগের দায়িত্বেও রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা পরিষদ চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০২০ সালের ১৯ আগস্ট গঠিত ৪১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, মুজিববর্ষ, ১৫ আগস্ট পালন এবং শেখ হাসিনার জন্মদিনসহ নানা আয়োজনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে প্রভাব বিস্তার করেন সুদীপ বসাক। ২০০৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের সময়ে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন সময়ে এসব নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২২ সালের ২৩ মার্চ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের যান্ত্রিক বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন সুদীপ বসাক। পরে বিদ্যুৎ ও পানি বিভাগের দায়িত্বও পান। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গাজীপুরে যোগদানের পর তিনি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের আস্থাভাজন হিসেবে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন সুদীপ বসাক। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও প্রশাসন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে তিনি নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, যান্ত্রিক বিভাগের কর্মচারী আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তিনি গাজীপুর সিটির ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের মুদাফা এলাকার বাসিন্দা। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ নেতা আজমত উল্লাহ খানের মাধ্যমে টঙ্গী পৌরসভায় কনজারভেন্সি (মাস্টাররোল) কর্মচারী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পরে তাকে যান্ত্রিক শাখায় নিয়মিত করা হয়।

দীর্ঘদিন ধরে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, আজমত উল্লাহ খান এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন আমজাদ হোসেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, টঙ্গী এলাকায় তিনি সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের ‘খাস লোক’ হিসেবেই পরিচিত।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিজেকে আওয়ামী লীগবিরোধী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন আমজাদ হোসেন। বর্তমানে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ভাড়ায় পরিচালিত গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গাসিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ। অথচ এই বিভাগের বিভিন্ন কাজের ফাইল অনুমোদনেও সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন সুদীপ বসাক ও আমজাদ হোসেন।

সম্প্রতি পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সিটির ৫৭টি ওয়ার্ডের আটটি অঞ্চলে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা, কোরবানির গোশত বিতরণের জন্য গরু-ছাগল ক্রয় এবং বর্জ্য অপসারণে নিয়োজিত শ্রমিকদের তিন দিনের খাবার সরবরাহ বাবদ ৬০ লাখ ৩৪ হাজার ৫০০ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সংক্রান্ত ফাইল অনুমোদন করেন যান্ত্রিক বিভাগের সুদীপ বসাক, আমজাদ হোসেন, রাসেল শাহরিয়ার ও আকরাম হোসেন। তবে ফাইল অনুমোদনের আগে বিষয়টি সম্পর্কে বর্জ্য বিভাগের কর্মকর্তারা অবগত ছিলেন না বলে জানা গেছে।

এছাড়া গত ১৬ মার্চ টঙ্গী অঞ্চলের ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের মরকুন পশ্চিমপাড়া বাইতুল ফালাহ মসজিদসংলগ্ন সড়কের পাশের ড্রেন পরিষ্কারের কাজেও একইভাবে ফাইল অনুমোদনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই কাজে ৩৫ শ্রমিকের বিপরীতে ৬ লাখ ৮২ হাজার টাকার ফাইল অনুমোদন দিয়ে কাজ বাস্তবায়ন করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমজাদ হোসেন বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী বর্জ্য বিভাগের কাজ আমাদের করার কথা নয়। তবে বর্জ্য বিভাগের নিজস্ব ইজিপি আইডি না থাকায় ইজিপির মাধ্যমে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।”

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা সোহেল রানা বলেন, “যান্ত্রিক বিভাগ থেকেই ফাইল অনুমোদন ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। আমার বর্জ্য শাখায় আইডি খোলা না থাকায় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফাইল অনুমোদন করা হয়।”

বর্জ্য বিভাগের কাজ যান্ত্রিক বিভাগ কেন পরিচালনা করছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বর্জ্য শাখায় জনবল সংকট রয়েছে।” তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত দায়ভার কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাককে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ