
ঢাকা-চট্টগ্রামে বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট ও বেনামি বিনিয়োগের তথ্য ঘিরে তোলপাড়; রেজিস্ট্রি অফিসে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
নিবন্ধন অধিদপ্তরের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্ট্রেশন (ডিআইজিআর) আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং সিন্ডিকেট পরিচালনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তার নামে-বেনামে বহুতল ভবন, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, জমি ও গোপন বিনিয়োগের তথ্য সামনে আসার পর প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অভিযোগগুলোর বিষয়ে ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে।
সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে রেজিস্ট্রি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে আশরাফুজ্জামান একটি শক্তিশালী আর্থিক সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দলিল নিবন্ধন, সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণ, নামজারি এবং বদলি-পদায়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হতো বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র মতে, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল নিবন্ধনের সময় সরকারি মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ তৈরি করা হতো। একই সঙ্গে নামজারি ও দলিল যাচাইয়ের নামে ফাইল আটকে রেখে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া লাভজনক সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও গোপন লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে আশরাফুজ্জামান এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতেন।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে সম্পদের বিস্তার
অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে উঠে এসেছে, একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়-ব্যয়ের সঙ্গে আশরাফুজ্জামানের সম্পদের পরিমাণের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরার মতো এলাকায় তার এবং পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস রয়েছে। এছাড়া সাভার ও পূর্বাচলে জমি কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় বহুতল ভবন, শপিং মলে বিনিয়োগ এবং বেনামি সম্পদের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বেনামি সম্পদ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নিজের নাম গোপন রাখতে আশরাফুজ্জামান দূর সম্পর্কের আত্মীয়, শ্বশুরবাড়ির সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সহযোগীদের নামে সম্পদ কিনেছেন। একই সঙ্গে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।
তার পরিবারে ব্যবহৃত বিলাসবহুল গাড়ি, দামী আসবাবপত্র, বিপুল অঙ্কের এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রের তথ্যও এখন গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে রয়েছে বলে জানা গেছে।
দুদকের অনুসন্ধান
দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে আশরাফুজ্জামান ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন এবং সম্পদের নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি সাব-রেজিস্ট্রি ও ভূমি অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এছাড়া রেজিস্ট্রি অফিসের কয়েকজন কর্মচারী ও দালাল চক্রের সদস্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হতে পারে।
প্রতিক্রিয়া ও জনমত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হন।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী বিশ্লেষকরা বলছেন, সংবেদনশীল পদে থাকা কর্মকর্তাদের সম্পদের বার্ষিক হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ এবং দুর্নীতির প্রমাণ মিললে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে অভিযোগের বিষয়ে আশরাফুজ্জামানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

