বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৬, ২০২৬

গ্রামীণ গ্রুপে কর ছাড় নিয়ে তোলপাড়: দেড় বছরে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঝুঁকিতে

দেশের ভঙ্গুর রাজস্ব পরিস্থিতির মধ্যেই প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য কর অব্যাহতি, কর মওকুফ ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘটনায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এসব সিদ্ধান্তে সরকারের বিপুল রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি বাজারে অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

পাঁচ বছরের করমুক্ত গ্রামীণ ব্যাংক

২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে (এসআরও নং-৩৩৯-আইন/আয়কর-৪৭/২০২৪) গ্রামীণ ব্যাংককে পাঁচ বছরের জন্য আয়কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সব ধরনের আয়ের ওপর করমুক্ত সুবিধা ভোগ করবে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রামীণ ব্যাংক গড়ে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আয়কর দিয়েছে।

  • ২০২৫-২৬ করবর্ষে আয়: ৪৮৯.৬৮ কোটি টাকা | কর: ১৯৫.৮৬ কোটি টাকা
  • ২০২৪-২৫ করবর্ষে আয়: ৭১০.৮১ কোটি টাকা | কর: ২৮২.৭৫ কোটি টাকা
  • ২০২৩-২৪ করবর্ষে কর: ১৭৭.১৫ কোটি টাকা
  • ২০২২-২৩ করবর্ষে কর: ১৫৫.১৫ কোটি টাকা

এই হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে সরকার অন্তত এক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইএমএফ শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক?

বিশ্লেষকরা বলছেন, যখন কর-জিডিপি অনুপাত নিম্নমুখী এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ পেতে কর অব্যাহতি কমানোর শর্ত রয়েছে, তখন নতুন করে এ ধরনের সুবিধা দেওয়া প্রশ্নবিদ্ধ।

সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কর অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও পুনর্বিবেচনা জরুরি। এলডিসি উত্তরণসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

সংসদের অনুমতি বাধ্যতামূলক

এদিকে ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর নতুন অর্থ অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কর অব্যাহতি দিতে হলে জাতীয় সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। আগে এনবিআর সরাসরি এই সুবিধা দিতে পারত।

শর্ত না মেনেও ভ্যাট সুবিধা

গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির বিরুদ্ধে ভ্যাট সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। শর্ত অনুযায়ী, অন্তত ৫০ শতাংশ ব্যাটারি ও চার্জার দেশে উৎপাদনের কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি আমদানিনির্ভর রয়েছে।

এনবিআর ও বুয়েটের যৌথ তদন্তে উৎপাদন যন্ত্রপাতির অভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবুও প্রতিষ্ঠানটি ১০ শতাংশের পরিবর্তে ৭.৫০ শতাংশ ভ্যাট সুবিধা ভোগ করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সুবিধার কারণে কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

গ্রামীণ কল্যাণের কর ফাঁকির অভিযোগ

গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্টের বিরুদ্ধে ২০১১-১২ করবর্ষ থেকে কর ফাঁকির অভিযোগ অনুসন্ধান করে এনবিআর প্রায় ১,০৪৩ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত করেছে। আপিল ও ট্রাইব্যুনালে হেরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি হাইকোর্টে রিট করে, যা এখনও বিচারাধীন।

৬৬৬ কোটি টাকা মওকুফের ঘটনা

গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্টের একটি আলোচিত ঘটনায় দেখা যায়, তারা গ্রামীণ টেলিকমকে দেওয়া ঋণের সুদকে ‘লভ্যাংশ’ হিসেবে দেখিয়ে কম কর দিয়েছে। এ নিয়ে এনবিআর ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত পাঁচ বছরে ৬৬৬ কোটি টাকা কর নির্ধারণ করে।

তবে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট রিট খারিজ করলেও, পরবর্তীতে ৩ অক্টোবর আদালত স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আগের রায় প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে এই ৬৬৬ কোটি টাকা আর পরিশোধ করতে হচ্ছে না।

অর্থনীতিতে প্রভাব নিয়ে শঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একদিকে রাজস্ব ঘাটতি, অন্যদিকে নির্বাচিত কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য কর অব্যাহতি—এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে একই খাতে অন্য ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, করনীতিতে স্বচ্ছতা, সমতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে রাজস্ব ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ