শনিবার, মে ২৩, ২০২৬

প্রকাশ্য নিলাম গোপনে বেনামে সারলেন এসিল্যান্ড

সরকারি গাছ কাঁটার জন্য আহ্বান করা হয় নিলাম। তবে, সেই নিলাম আর অনুষ্ঠিত হয়নি। গোপনে ও বেনামে নিলাম প্রক্রিয়া সেরেছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড)। এমনকি, নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা ব্যক্তি নিজেও জানেন না কবে এবং কোথায় নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সম্প্রতি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এ ঘটনা ঘটেছে।

অভিযোগ উঠেছে, উপজেলার এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম গোপনে ও বেনামে এ নিলাম প্রক্রিয়া সেরেছেন। এছাড়া নিলামের নামে অতিরিক্ত সরকারি গাছ বিক্রির অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘আর্থিক সুবিধা নিয়ে’ পছন্দের ব্যক্তির কাছে নামমাত্র মূল্যে সরকারি গাছ বিক্রি করতেই এই গোপন নিলাম করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, যোগসাজশে নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষিত গাছের সংখ্যার চেয়ে অতিরিক্ত গাছ কাঁটা হয়েছে। আইন ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে তড়িঘড়ি করে গোপনে নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন এসিল্যান্ড আরিফূল ইসলাম। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে যাকে নির্ধারণ করা হয়েছে তিনি নিলাম প্রক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি, কোথায় নিলাম ডাক অনুষ্ঠিত হয়েছে তাও জানেন না সর্বোচ্চ দরদাতা। এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম। তার দাবি, তিনি যা করেছেন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উন্নয়নের জন্য করেছেন। একইসঙ্গে অতিরিক্ত গাছ কাঁটার বিষয়টি নাকচ করেছেন তিনি। যদিও তার দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি।

নিলাম বিজ্ঞিপ্তি সূত্রে জানা গেছে, কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নতুন ভবন, পার্কিং ও রাস্তা নির্মাণ কাজ বাস্তবায়নের জন্য অফিস চত্বরে থাকা ১৭ টি মেহগনি ও একটি কাঁঠাল গাছসহ ছোটবড় মোট ২১টি গাছ প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে কেটে অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়। এ নিয়ে গত ৫ মার্চ প্রকাশ্য নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে গাছ নিলাম কমিটি। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওই কমিটির সভাপতি এবং এসিল্যান্ড কমিটির সদস্য সচিব।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ১৫ মার্চ কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিস চত্বরে প্রকাশ্য নিলাম ডাকের মাধ্যমে এসব গাছ বিক্রি করা হবে। ২১টি গাছের নিলাম ডাক মূল্য নির্ধারণ করা হয় এক লাখ এক হাজার ৪১০ টাকা। তবে, বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত প্রকাশ্য নিলাম ডাকের তারিখে ভূমি অফিস চত্বরে গিয়ে আগ্রহীরা কোনও ডাক আয়োজন দেখতে পাননি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিজ্ঞপ্তিতে ইউনিয়ন ভূমি অফিস চত্বরের নিলাম ডাকের কথা থাকলেও কোনও ঘোষণা ছাড়াই গোপনে নিজ কার্যালয় সদর উপজেলা ভূমি অফিসে বেনামে নিলাম প্রক্রিয়া সেরে ফেলেন এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম। মাত্র তিনজন ব্যক্তিকে উপস্থিত ও নিলামে অংশগ্রহণকারী দেখিয়ে এক লাখ ১২ হাজার টাকায় নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন দেখানো হয়। নুর আলম নামে এক ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত করা হয়। তবে, নুর আলম নিলাম ডাকে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি নিজেও জানেন না কবে এবং কোথায় নিলাম ডাক সম্পন্ন হয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এসিল্যান্ড গোপনে ও বেনামে নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। শুধু তাই নয়, নিলামে ২১ টি গাছ বিক্রি করা হলেও ঈদের ছুটির সুযোগ নিয়ে ২৮টি গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত এসব গাছের জন্য বাড়তি সুবিধা নিয়েছেন নিলাম সংশ্লিষ্টরা।

গাছ কাঁটার সময় ভূমি অফিসের কোনও কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন না। ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মঞ্জুরুল ইসলাম গাছ কাটার সময় উপস্থিত না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা সাদেকুল ইসলাম মিলন বলেন, “বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ্য নিলাম হওয়ার কথা ছিল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। কিন্তু, গোপনে নিলাম হয়েছে উপজেলা ভূমি অফিসে। এটা সম্পূর্ণ অনিয়ম এবং দুর্নীতির মাধ্যমে হয়েছে। আমরা শুনেছি, সরকারি রেটের বাইরে অতিরিক্ত টাকা লেনদেন হয়েছে। যোগসাজশ করে এসব সরকারি গাছ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করেছেন এসিল্যান্ড। আমরা এটার সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছি।”

স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল হক বলেন, “তিন লক্ষাধিক টাকা মূল্যের গাছ গোপনে নামমাত্র মূল্যে নিলাম করা হয়েছে। নিলাম ডাকা হলো একখানে আর সম্পন্ন হলো আরেকখানে। গাছও কাঁটাও হলো বেশি। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।”

কাঁঠালবাড়ী বাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল হক বলেন, “এই নিলাম প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে। এসিল্যান্ড গোপনে তার নিজ অফিসে এই নিলাম করেছেন। নিলামে অংশ নিতে আগ্রহী ব্যক্তিরা এ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি । ২১টি গাছের নিলাম ডেকে ২৮টি গাছ বিক্রি করা হয়েছে। সরকারি অফিস এত বড় দুর্নীতি মেনে নেওয়া যায় না। আমরা চাই তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়া হোক।”

অতিরিক্ত গাছ কাঁটার কথা স্বীকার করেছেন সদর উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জুল জালাল। তিনি বলেন, “বন বিভাগ ২১টি গাছ চিহ্নিত করলেও লে-আউটের জন্য দুই-একটি গাছ বেশি কাঁটা হয়েছে। তবে তা এসিল্যান্ড স্যারের অনুমতি সাপেক্ষে।”

সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত নুর আলম বলেন, “আমি জানি না কবে কোথায় নিলাম হয়েছে। আমি উপস্থিত ছিলাম না। শুনেছি আমার নামে আমার মামা নিলাম ডাকে অংশ নিয়েছিলেন।”

সব অভিযোগ অস্বীকার করে এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম বলেন, “নিলাম প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যারা নিলামে অংশ নিয়েছেন তাদেরকে আমাদের স্টাফরা সঙ্গে করে ভূমি অফিসে নিয়ে এসে নিলাম ডাক সম্পন্ন করেছি। ২১টি গাছের নিলাম হয়েছে। যদি বেশি সংখ্যক গাছ কাঁটা হয়ে থাকে তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সর্বোচ্চ দরদাতা নিলামে অংশ না নেওয়া প্রশ্নে এসিল্যান্ড বলেন, “কেউ যদি কারও নামে নিলামে অংশ নেন সেটাতো জাস্টিফাই করা সম্ভব নয়। উনি না থাকলে ওনার প্রতিনিধি হয়তো ছিলেন।”

নিলাম কমিটির সভাপতি ও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো.ইসমাইল হোসেন ছুটিতে থাকায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

@banglatribune

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ