
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ পরিবারের এত সম্পদ!
>বিদেশে ৯০৮টি বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট ও প্রতিষ্ঠান ক্রোক
<span;>> দেশে হাজার হাজার একর জমি ক্রোক
>দেশে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট ক্রোক
>অবরুদ্ধ হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক হিসাব
এসিএম নিউজ, ঢাকা
সাবেক ভূমি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ পরিবারের এত সম্পদ রয়েছে যা অকল্পনীয়। দেশ-বিদেশে রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। দেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে তার ৯০৮ টি বাড়ি এপার্টমেন্ট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভবন ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ গত ১৩ জানুয়ারি ১৩ জানুয়ারি সাইফুজ্জামান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্টদের ৭ দেশে থাকা ৩২৮ টি অ্যাপার্টমেন্ট, বাড়ি ও দোকান ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, দুবাই ও কম্বোডিয়ার এসব সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দেন ঢাকার মহানগর দায়রা জজ ও সিনিয়র বিশেষ জজ আদালত।
এসব সম্পদের মোট ক্রয় মূল্য দেখানো হয়েছে ১৮২৪ কোটি ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯০৫ টাকা।যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টি, মালয়েশিয়ার ৪৭ টি, থাইল্যান্ডের ২৩ টি, ভিয়েতনামের ৩৩ টি, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ৯টি, দুবাইয়ে ৫৯ ও কম্বোডিয়ায় ১১৭ টিঅ্যাপার্টমেন্ট, বাড়ি ও দোকান ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের মোট ক্রয় মূল্য ৪৩৬ কোটি ৮৮ লাখ ৬৫ হাজার ২৪২ টাকা, মালয়েশিয়ার সম্পদের ক্রয় মূল্য ৩১ কোটি ৪৮ লাখ ১৭৪ টাকা, থাইল্যান্ডের সম্পদের ক্রয় মূল্য ১৩৯ কোটি ১৬ লাখ ৭৬ হাজার ৬৯২ টাকা, ভিয়েতনামের সম্পদের ক্রয় মূল্য ৮৩ কোটি ২৫ লাখ ২৯ হাজার ২৯ টাকা, ভারতের সম্পদের ক্রয় মূল্য ৯ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ১০০ টাকা, দুবাইয়ের সম্পদের ক্রয় মূল্য ৬৯৮ কোটি ৭১ লাখ ৭২ হাজার ৯৬৮ টাকা ও কম্বোডিয়ার সম্পদের ক্রয় মূল্য ৪৩৩ কোটি ৬৩ লাখ ১৩ হাজার ৯০০ টাকা।
এর আগে গত বছর ১৭ অক্টোবর সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের নামে থাকা দেশ-বিদেশের ৫৮০ বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, জমিসহ স্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি ব্যাংকের হিসাব ও বাংলাদেশের একটি ব্যাংকের হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেওয়া হয়।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশের আদালত সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিদেশে থাকা মোট ৯৮ টি বাড়ি এপার্টমেন্ট ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আরও যে সব সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ:
গত বছর ৫ মার্চ তাঁর ৩৯ টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। গত বছর ৯ মার্চ সাইফুজ্জামানের ১০২ কোটি টাকার শেয়ার অবরুদ্ধ এবং ৯৫৭ বিঘা জমি ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়। গত বছর ৯ জুলাই ৫৭৬ কোটি টাকার বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার অবরুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।গত বছর ৫ অক্টোবর সাইফুজ্জামান এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় থাকা ছয়টি ফ্ল্যাট ও নয়টি ভবন ক্রোকের নির্দেশ দেন আদালত। গত বছর ২৮ অক্টোবর ৪৪ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্রে যারা গেছে সাইফুজ্জামান এর বিদেশে যেসব সম্পদ রয়েছে তার মূল্য ১৯ হাজার কোটি টাকার ওপরে। বিদেশি ৯০৮টি বাড়ি ছাড়াও আরো তিন থেকে সাড়ে ৩০০ বাড়ি রয়েছে বলে দুদক জানতে পেরেছে। ওই সব বাড়ি বা স্থাপনা সনাক্তের কাজ করছে দুদক।
কেন ক্রোক ও অবরুদ্ধের আদেশ:
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সাইফুজ্জামান এর স্থাবর অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধের নির্দেশ দেন বিভিন্ন তারিখে।
দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান ঘুষ দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়মের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করে দখলে রেখেছেন ও বিদেশে অর্থ পাচার করে সম্পদ অর্জন করেছেন। ইতি মধ্যে তার বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে ও অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে। তার দুর্নীতি ও অর্থপাচারের ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে। আবার মামলাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম চলছে।
প্রত্যেকটি আবেদনে বলা হয়েছে, সাইফুজ্জামান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের যেসব সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলো অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ। অবৈধ অর্জিত সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা না হলে সাবেক ভূমি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট রা এসব সম্পদ হস্তান্তর, বিক্রয় ও স্থানান্তর করবেন। আর এসব সম্পদ হাতছাড়া হলে রাষ্ট্রের অপুরণীয় ক্ষতি হবে।
আয়কর নথিতে নেই এসব সম্পদ:
দুদকের বিভিন্ন আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাইফুজ্জামান একসময় প্রতিমন্ত্রী ও পরে ভূমি মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এই দায়িত্ব পালনকালেই তিনি সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। তবে তার আয়কর নথিতে এসব সম্পদের উল্লেখ নেই।
অবৈধ সম্পদ অর্জনে জড়িত তার পরিবারের সদস্যরাও:
শুধু সাইফুজ্জামান নিজেই নন তার স্ত্রী রুকমিলা জামান, তার ভাই ও সন্তানেরাও অবৈধ সম্পদ অর্জনে তাকে সহায়তা করেছেন। দুদকের বিভিন্ন আবেদনে এই তথ্য দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে শত শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। আরো মামলা করা হচ্ছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
পলাতক সাইফুজ্জামান ও তার পরিবারের সদস্যরা:
২০২৪ সালে ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৭ অক্টোবর সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী রুকমিলা জামানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। কিন্তু তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তার পরিবারের কেউই এখনো আটক হননি।
সম্প্রতি সাইফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ রেড নোটিশ জারি করার নির্দেশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের একটি আদালত।
২০১৩ উপনির্বাচনে চট্টগ্রাম-১২ আসন থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন সাইফুজ্জামান। এরপর ২০১৪ সালের ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে আবার নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে নির্বাচিত হন। পরে তিনি ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে আবার নির্বাচিত হন।

