
হাসপাতালে চিকিৎসক রোগী দেখে প্রয়োজনে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেন। এসব পরীক্ষা করতে দরকার হয় বড় বড় মেশিন ও রাসায়নিক। একেক পরীক্ষার জন্য একেক রাসায়নিক লাগে। এগুলোকে বলা হয় রিএজেন্ট। মেশিন ও রিএজেন্ট—সবই বিদেশ থেকে আনতে হয়। উন্নত বিশ্বের নামি-দামি কোম্পানিগুলো স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে এসব রপ্তানি করে। কিন্তু মেশিনগুলো বেশ দামি হওয়ায় আমাদের মতো গরিব দেশের হাসপাতালগুলো সব কিনতে পারে না। তাই কোম্পানিগুলো একটা বুদ্ধি বের করেছে। সরকারি-বেসরকারি অনেক হাসপাতালে তারা এসব মেশিন অনুদান বা উপহার হিসেবে দেয়। কিন্তু যে কোম্পানির মেশিন, সেই কোম্পানিরই রিএজেন্ট লাগে, নইলে পরীক্ষা হবে না। তাই মেশিন ফ্রি দিয়ে বাধ্য করে রিএজেন্ট কিনতে। এভাবে তারা রিএজেন্টের ব্যবসাটা একচেটিয়া করে নেয়।
এ পর্যন্ত কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু সমস্যা পরে হলোই! অসাধু ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ক্যাডার, মধ্যস্বত্বভোগী আর হাসপাতালের স্বার্থান্বেষী লোকজন মিলে গড়ে তুলেছে দুর্নীতির এক বিশাল চক্র। অতি সঙ্গোপনে সূক্ষ্ম কারসাজির মাধ্যমে তারা লুটে চলেছে রাষ্ট্রের টাকা। দীর্ঘ অনুসন্ধানের মাধ্যমে জাগো নিউজ তুলে এনেছে এই দুর্নীতির সম্পূর্ণ এক অজানা গল্প।
৭ আগস্ট, বিকেল সোয়া ৫টা। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট (এনআইসিভিডি) ও হাসপাতাল। দক্ষিণ ব্লকের সামনে ১ নম্বর গেটে দেখা গেলো, একটি নীল রঙের পিকআপ দাঁড়িয়ে। আলো-আঁধারে নামানো হচ্ছে মালপত্র—কিছু কার্টন, কিছু মেশিনারিজের প্যাকেট। সেগুলো সিসিইউর সামনে দিয়ে তড়িঘড়ি করে নেওয়া হচ্ছে প্যাথলজি বিভাগে।
আশপাশে লোকজন আছে, তবে পরিবেশ থমথমে। সবার চালচলন-আচরণ একটু অস্বাভাবিক। কেমন যেন সন্দেহজনক! যারা ট্রলি ঠেলে মালপত্র নিচ্ছেন, তাদের মধ্যে অন্তত দুটি পরিচিত মুখ দেখে খটকা আরও বাড়লো। এদের একজন এই হাসপাতালেরই প্যাথলজি বিভাগের প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) ডা. আব্দুল্লাহ আল মুয়ীদ খান এবং অন্যজন ল্যাব ইনচার্জ গনেশ চন্দ্র তরফদার। কুলি বা কোম্পানির লোক বাদ দিয়ে এই কর্মকর্তারা কেন ট্রলি ঠেলছেন, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন সতর্ক ভঙ্গিতে?
আমরাও কাজ করতে গিয়ে সরকারি ক্রয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে এমন অসামঞ্জস্য পেয়েছি। এক রিএজেন্ট বা অ্যাক্সেসরিজ একেক হাসপাতাল একেক দামে কেনে। এটা হওয়া উচিত নয়। সব জায়গায় একই দামে হওয়া উচিত। এজন্য একটি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।- ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের উপ-পরিচালক ডা. নাজমুন নাহার
নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়ে এই কর্মযজ্ঞ চললো সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। কিন্তু কাউকে কিছু জিজ্ঞাস করার মতো অনুকূল পরিবেশ মিললো না ওই রাতের অন্ধকারে।
পরদিন সকালেই আবার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। দিনভর তৎপরতার পর জানা গেলো আগের দিনের বিকেল-সন্ধ্যার রহস্যময় কর্মযজ্ঞের আদ্যোপান্ত। পিকআপভর্তি কার্টন ও প্যাকেটে নামানো হয়েছে রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার আটটি মেশিন ও সরঞ্জাম। মেশিনগুলো এনআইসিভিডির প্যাথলজি বিভাগে অনুদান বা উপহার দিতে চেয়েছে এবিসি করপোরেশন, বায়োটেক সার্ভিসেস ও এসএস এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এসব মেশিন গ্রহণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সায় নেই। তাই একরকম ‘ব্যাকডোর’ দিয়ে মেশিনগুলো ঢোকানো হয় হাসপাতালে।
ডা. আব্দুল্লাহ আল মুয়ীদ খান ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট গণেশ চন্দ্র তরফদার ৭ আগস্ট সন্ধ্যার পর অননুমোদিত মেশিন হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে প্রবেশ করান। ছবি: গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত
কিন্তু কেন? এসব মূল্যবান মেশিন বিনামূল্যে কোম্পানিগুলো কেনই বা উপহার দেবে হাসপাতালে, আর সেই ফ্রি উপহার নিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরই বা এত রাখঢাক-লুকোচুরি কেন? এসব প্রশ্ন মাথায় নিয়ে প্রায় তিন মাস ধরে অনুসন্ধান চালায় জাগো নিউজ। বেরিয়ে আসে চমকে ওঠার মতো এক দুর্নীতির কাহিনি। অনুদান বা উপহারের মেশিনের জন্য বাজারদরের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি দামেও রিএজেন্ট কেনা হচ্ছে সরকারি হাসপাতালগুলোয়। আর এভাবে লুটে নেওয়া হচ্ছে সরকার তথা জনগণের বিপুল অর্থ।
যে মেশিন, সেই রিএজেন্ট
রোগ নির্ণয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মেশিন প্রস্তুতকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মিনড্রের বাংলাদেশের পরিবেশক এবিসি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার সৌরভ জাগো নিউজকে বলেন, ‘রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রগুলোর বিশ্বব্যাপী নিয়ম হলো—যে কোম্পানির মেশিন, সেই কোম্পানির রিএজেন্টই কাজ করবে। অন্য কারও রিএজেন্ট ওই মেশিনে খাটবে না। তাই কোনো হাসপাতালে যে মেশিনই বসানো হোক, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ওই কোম্পানির রিএজেন্টই কিনতে হবে।’
আর ঠিক এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে যন্ত্র ব্যবসায়ীরা হাসপাতালগুলোর অসাধু চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে গড়ে তুলেছে অতিমুনাফার এক অশুভ চক্র। যন্ত্র ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে উপহারের কথা বলে বিনামূল্যে নানান রকম যন্ত্র বসিয়ে দেন। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ওই কোম্পানির রিএজেন্টই কিনতে হয়। এই পর্যন্ত একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলেই প্রচলিত হয়ে আসছে। কিন্তু অনুসন্ধানের আরও গভীরে গিয়ে জাগো নিউজ দেখতে পায়, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অস্বাভাবিক বেশি দামে রিএজেন্ট কিনছে।
গত তিন মাসে রাজধানীসহ দেশের সাতটি সরকারি হাসপাতাল, পাঁচটি বেসরকারি হাসপাতাল এবং যন্ত্র ও রিএজেন্ট প্রস্তুতকারী চারটি কোম্পানির হিসাব-নিকাশসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের নথি-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। এরপর দুজন ল্যাব স্পেশালিস্ট চিকিৎসক, দুজন বায়োকেমিস্ট ও পাঁচজন টেকনোলজিস্টের সহায়তায় সেগুলো বিশ্লেষণ করে প্রমাণ পাওয়া যায়—বাজারদরের চেয়ে অন্তত চার-পাঁচ গুণ বেশি দামে রিএজেন্ট কেনা হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে।
এভাবে সেই বিনামূল্যে দেওয়া যন্ত্রের দাম অল্প সময়ের মধ্যেই উসুল হয়ে যায়। তারপর শুধুই লাভ।
এখানেই থামেনি জাগো নিউজ। আরও অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে একদল মধ্যস্বত্বভোগী, যাদের কারণে হাসপাতালগুলো থেকে লুট হয়ে যাচ্ছে জনগণের স্বাস্থ্যসেবার জন্য সরকারি ভর্তুকির বিপুল টাকা। যন্ত্র ও রিএজেন্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তিনজন কর্মকর্তা, গ্রহণকারী হাসপাতালের চারজন প্রতিনিধি আর দুজন মধ্যস্বত্বভোগীর সঙ্গে কথা বলে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে জাগো নিউজ নিশ্চিত হয়- সরকারি টাকা লুটপাটের এই কারসাজি চলছে পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে। এতে জড়িত হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও কর্মকর্তা, রিএজেন্ট সরবরাহকারী ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। আর এই কাজে তারা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক এক টেন্ডার কৌশলের আশ্রয় নিয়ে চলছে নিরাপদে, নির্বিঘ্নে।
উপহারের ছড়াছড়ি
সারাদেশের কতটি হাসপাতালে অনুদানের মেশিন আছে, সে তথ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর—কোথাও পাওয়া যায়নি। তবে শীর্ষ কর্তারা বলছেন, সরকারি টাকায় কেনা মেশিন আছে সারাদেশে মোট ২৫ হাজার ৬৮৭টি। এর মধ্যে রিএজেন্ট প্রয়োজন হয় এমন মেশিনের সংখ্যা খুবই কম। রিএজেন্টের মেশিন বেশিরভাগই ফ্রিতে উপহার পাওয়া বলে জানান তারা। তবে বেসরকারি পর্যায়ে এসব মেশিনের তথ্য তাদের কাছে নেই
কয়েকটি সরকারি হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক জাগো নিউজকে জানান, উপহার বা অনুদান হিসেবে মেশিন দিতে ও নিতে হলে কয়েকটি প্রচলিত ধাপ পার হতে হয়। প্রথমে উপহারদাতা কোম্পানিকে হাসপাতালে আবেদন করতে হয়। সেই আবেদন সংশ্লিষ্ট কমিটি মূল্যায়ন করে মতামত দেয়। এরপর সেই মতামতের ভিত্তিতে হাসপাতালের পরিচালক/তত্ত্বাবধায়ক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সম্মতি দিলেই কেবল মেশিন হাসপাতালে এনে স্থাপন করানো হয়।

