
রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রীর মেরাদিয়া এলাকায় সরকারি খাসজমি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিত্যক্ত সম্পত্তি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করে বহুতল ভবন, মার্কেট ও আবাসন প্রকল্প নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের দাবি, জাল কাগজপত্র, প্রভাব খাটানো এবং বিভিন্ন কৌশলে বছরের পর বছর ধরে জমি দখল করে প্রতিষ্ঠানটি কোটি কোটি টাকার ব্যবসা গড়ে তুলেছে। ফলে নিজেদের বৈধ জমি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।
ভুক্তভোগীদের একজন মোহন মিয়া জানান, জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর ২০২১ সালে দেশে ফিরে তিনি দেখেন তার জমিতে বালু ভরাট করে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। পরে জানতে পারেন, ইস্টার্ন হাউজিং তার জমি অন্যের কাছ থেকে কেনার দাবি করছে। যদিও ওই ব্যক্তিদের তিনি কখনো চিনতেন না এবং স্থানীয়রাও তাদের পরিচয় জানেন না। জমির সব কাগজপত্র দেখানোর পরও তিনি নিজের জমির দখল ফিরে পাননি বলে অভিযোগ করেন।
একইভাবে হরিচরণ রায়ের ৯১ শতাংশ জমিতে বর্তমানে ১০ তলাবিশিষ্ট একটি মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই মার্কেটে প্রায় ২৪০টি ফ্ল্যাট ও ৫৩০টির মতো দোকান রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জমিটি বর্তমানে সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ায় ফ্ল্যাট ও দোকান বিক্রি হলেও ক্রেতাদের এখনো দলিল বুঝিয়ে দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এতে একদিকে যেমন জমির প্রকৃত মালিকরা বঞ্চিত হয়েছেন, অন্যদিকে ক্রেতারাও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দক্ষিণ বনশ্রীর মেরাদিয়া মৌজায় প্রায় ৫ একর ৯২ শতক সরকারি খাসজমিও ইস্টার্ন হাউজিংয়ের দখলে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, স্থানীয়দের অনেক জমি প্রকল্পের লে-আউটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হয়। পরে প্রকৃত মালিকরা ভবন নির্মাণের অনুমোদন না পেয়ে বাধ্য হয়ে কম দামে জমি বিক্রি করে দেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুধু ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিই নয়, শ্মশান, মন্দির, খেলার মাঠ, জলাশয় ও অন্যান্য সামাজিক স্থাপনাও দখলের শিকার হয়েছে। অনেকের দাবি, কোনো জমি দখলের আগে সেখানে বালু ভরাট করে মসজিদ, মাদ্রাসা, খেলার মাঠ বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হতো। পরে ধাপে ধাপে জমিটি প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হয়।
সরেজমিনে গিয়ে আরও দেখা গেছে, ইস্টার্ন হাউজিংয়ের প্রকল্প এলাকায় নিজেদের জমির কাগজপত্র নিয়ে প্রতিদিন বহু ভুক্তভোগী সমাধানের আশায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে আসছেন। তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ঘুরেও তারা জমি বা ক্ষতিপূরণ কোনোটিই পাননি।
বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের (রিহ্যাব) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে বহু মানুষের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। অনেক গ্রাহক প্লট ও জমির আশায় জীবনের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগ করলেও এখনো তাদের ন্যায্য অধিকার পাননি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ বিক্রি করে ভুক্তভোগীদের পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করা উচিত। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ও সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইস্টার্ন হাউজিং। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী মহাব্যবস্থাপক মো. ফরহাদুজ্জামান বলেন, অন্যের জমি দখল করে প্রতিষ্ঠানটি কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে না। জমির মালিকানা নিয়ে কোথাও বিরোধ থাকলে তা আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, একটি প্রকল্পে নামজারি-সংক্রান্ত মামলা চলমান থাকায় কিছু ফ্ল্যাট ও দোকানের দলিল এখনো হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি।

