
রাজধানীতে নিজের একটি প্লট বা ফ্ল্যাটের স্বপ্ন দেখিয়ে হাজারো মানুষের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে নাসিম রিয়েল এস্টেটের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ইমাম হোসেন নাসিম জীবদ্দশায় কোনো গ্রাহককে প্রতিশ্রুত প্লট বা ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে পারেননি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তার মৃত্যুর পরও বিনিয়োগকারীরা অর্থ ফেরত বা সম্পত্তির দখল না পেয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, নাসিমের রেখে যাওয়া বিপুল সম্পদ বর্তমানে তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তারা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এড়িয়ে চলছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইমাম হোসেন নাসিম প্রথমে ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ২০০২ সাল থেকে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় যুক্ত হয়ে সাভারের কাউন্দিয়া এলাকায় সাধারণ মানুষের জমি এবং সরকারি খাসজমিকে কেন্দ্র করে আবাসন প্রকল্পের প্রচার শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, আবাসিক শহর গড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেন তিনি। ২০২০ সালের অক্টোবরে প্রতারণার অভিযোগে নাসিম ও তার তৃতীয় স্ত্রী হালিমা আক্তার সালমাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে তারা জামিনে মুক্তি পান। কয়েক বছর আগে মারা যান নাসিম।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতারণার শিকার হুমায়ুন কবির জানান, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে তিনি ২০১৪ সালে সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়নে তিন কাঠা জমি কেনার জন্য সদস্যপদ ও কিস্তির মাধ্যমে প্রায় ১২ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও তিনি প্লট বুঝে পাননি কিংবা অর্থও ফেরত পাননি। মিরপুরে নাসিম টাওয়ারে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান পাননি বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, তার মতো আরও শত শত গ্রাহক একইভাবে প্রতারিত হয়েছেন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নাসিমের মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া ব্যাংক আমানত, মিরপুরের ভবন, ফ্ল্যাট এবং সাভারের কাউন্দিয়ার বিভিন্ন প্লট বর্তমানে তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মিরপুর দারুসসালাম এলাকার একাধিক ভবন ও ফ্ল্যাট ছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট, কুয়াকাটা, গাজীপুর এবং সাভারে তার নামে জমি ও স্থাপনা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, একসময় পূর্বাচল, কাউন্দিয়া, মিরপুরের তামান্না পার্ক ও নবাবেরবাগ এলাকায় নাসিম রিয়েল এস্টেটের প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রির বড় বড় বিলবোর্ড থাকলেও এখন সেগুলোর অধিকাংশই সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে মিরপুর-১-এর চিড়িয়াখানা রোডের জি-ব্লকে ২৫ থেকে ২৯ নম্বর প্লটজুড়ে নাসিম টাওয়ার নামে তিনতলা একটি ভবন রয়েছে। ভবনটির দ্বিতীয় তলায় প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় হলেও অধিকাংশ সময় সেটি তালাবদ্ধ থাকে।
স্থানীয়দের দাবি, মাঝে মধ্যে নাসিমের স্ত্রী ও ছেলে অফিসে এলেও কোনো গ্রাহক টাকা বা প্লটের বিষয়ে যোগাযোগ করতে এলে আগেই তাদের খবর দেওয়া হয়। এরপর তারা দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। ভবনটির নিচতলায় দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মীকেও এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই ভবনের দোকান ও রেস্টুরেন্ট থেকে প্রতি মাসে ভাড়া সংগ্রহ করা হয় বলেও স্থানীয়রা জানান।
ইমাম হোসেন নাসিমের তৃতীয় স্ত্রী হালিমা আক্তার সালমার চাচা মো. ইউনূস বর্তমানে নাসিম টাওয়ারের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। তিনি বলেন, নাসিম জীবিত অবস্থায় মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর এখন তার স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষে সেই অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তবে নাসিমের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তাদের মোবাইল নম্বর দিতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।
মিরপুরের বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমানের দাবি, নাসিমের প্রথম স্ত্রী ও ছেলে বর্তমানে সম্পত্তি দেখভাল করছেন এবং নাসিম টাওয়ারের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন ইউনূস। তার অভিযোগ, প্রতারণার মাধ্যমে গড়ে ওঠা এসব সম্পদ বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা ভোগ করছেন, অথচ ভুক্তভোগীরা অর্থ বা প্লট কোনোটিই পাচ্ছেন না।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, প্রতি মাসে দোকান ও রেস্টুরেন্টের ভাড়া নিতে নাসিমের পরিবারের সদস্যরা এলেও পাওনাদারদের সঙ্গে দেখা করা এড়িয়ে চলেন। টাকা ফেরত চাইতে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে তারা কোনো ধরনের আলোচনা করেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাসিম টাওয়ারের নিরাপত্তাকর্মী মো. দেলোয়ার জানান, প্রতিদিন চার থেকে পাঁচজন পাওনাদার অফিসে আসেন। শুরুতে তিনি বলেছিলেন, নাসিমের স্ত্রী ও ছেলে খুব একটা আসেন না। পরে তিনি জানান, মাস শেষে তারা দোকান ও রেস্টুরেন্টের ভাড়া সংগ্রহ করতে নিয়মিত আসেন। তার ভাষ্য, অনেক ভুক্তভোগী এসে কান্নাকাটি করেন এবং তিনি তাদের সবাইকে একসঙ্গে আইনি উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
পাশের একটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী রফিকুল ইসলাম বলেন, নাসিম টাওয়ার দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন ইউনূস, যিনি নাসিমের তৃতীয় স্ত্রীর আত্মীয় হলেও নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন না।
সূত্র জানায়, ২০০২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মিরপুর, পূর্বাচল ও সাভারের কাউন্দিয়ায় ‘নাসিম সিটি’ ও ‘নাসিম রিভার ভিউ’ নামে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের বিজ্ঞাপন দিয়ে প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রি করা হয়। পরে প্রতারণার অভিযোগে ২০২০ সালে ভুক্তভোগীরা নাসিমের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে অসুস্থতার কারণে জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি মারা যান।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বর্তমানে নাসিমের স্ত্রী ও ছেলে তাদের জানিয়ে দিচ্ছেন—যার কাছে টাকা দেওয়া হয়েছিল তিনি মারা গেছেন, তাই তারা এ দায় নিতে চান না।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কাউন্দিয়া এলাকায় অন্যের জমি ও খাসজমিকে কেন্দ্র করে প্লট বিক্রির নামে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কাছ থেকে পাঁচ লাখ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এছাড়া কয়েকশ গ্রাহকের নামে ভুয়া নিবন্ধনের অভিযোগে প্রত্যেকের কাছ থেকে আরও ৮২ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব কার্যক্রমে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি সহযোগিতা করেছিলেন।
সরেজমিনে কাউন্দিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এখনো স্বল্পমূল্যের প্লটের আশায় প্রতিদিন বহু মানুষ সেখানে যাচ্ছেন। সেই সুযোগে এলাকায় জমি কেনাবেচার বাজার গড়ে উঠেছে। স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য হানিফ বলেন, নাসিম রিয়েল এস্টেট প্লট বিক্রির নামে প্রতারণা করেছিল। এখনও কিছু প্রতিষ্ঠান একই কৌশলে সাইনবোর্ড টানিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কাউন্দিয়ার স্থায়ী বাসিন্দারা নাসিম রিয়েল এস্টেট থেকে প্লট কেনেননি। কারণ প্রতিষ্ঠানটি যে দামে এক শতাংশ জমি বিক্রি করেছিল, স্থানীয় বাজারে একই দামে তিন শতাংশ পর্যন্ত জমি পাওয়া যেত। তাদের অভিযোগ, বাইরের মানুষকে আকৃষ্ট করতেই ভুয়া প্রচারণা চালানো হয়েছিল।
বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের (রিহ্যাব) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, নাসিম রিয়েল এস্টেট বহু মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং ভুক্তভোগীদের পাওনা অর্থ পরিশোধ করেনি। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত মানুষ তাদের জীবনের সঞ্চিত অর্থ হারিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে কিছু অসাধু রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে থাকে। তার মতে, এ ধরনের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের নামে থাকা সম্পদ বিক্রি করে ভুক্তভোগীদের অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা উচিত। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ দ্রুত ফেরত দিতে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারে বলেও তিনি মত দেন।
অন্যদিকে, প্রতারণার অভিযোগ প্রসঙ্গে ইমাম হোসেন নাসিমের ছেলে মাহাদী হাসান বলেন, যারা প্রকৃত ভুক্তভোগী তাদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে পর্যায়ক্রমে অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। আর যেসব গ্রাহক আদালতে মামলা করেছেন, সেসব মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

