বুধবার, জুলাই ৮, ২০২৬

শ্রমবাজার দু’র্নী’তি: ২১৩ অভি’যুক্ত’কে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ, ২৫ জনের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের সুপারিশ

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়: ১০০ রিক্রুটিং এজেন্সির ২৩২ জনের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত, সম্পদ যাচাই শুরু

২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর নামে সরকার নির্ধারিত ফি’র কয়েকগুণ অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে দায়ের করা মামলার আসামি ও সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত সম্পদও খতিয়ে দেখা শুরু করেছে সংস্থাটি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, শ্রমবাজারে দুর্নীতির অভিযোগে এ পর্যন্ত ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৩২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলার অধিকতর তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তদের মধ্যে ২১৩ জনকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারি করেছে কমিশন।

মামলার নথি অনুযায়ী, ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মোট ৭ হাজার ৯৮৪ কোটি ১৫ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-২ শাখার পরিচালক (বর্তমানে এলপিআররত) এস এম এম আখতার হামিদ ভূঞার স্বাক্ষরিত এক পত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন প্রান্তিক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফা। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে নিজের নামে ও বেনামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(১) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি তাকে, তার স্ত্রী এবং তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের নামে বা বেনামে অর্জিত সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, দায়-দেনা, আয়ের উৎস এবং সম্পদ অর্জনের বিস্তারিত বিবরণ আদেশ প্রাপ্তির ২১ কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত ফরমে কমিশনে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।

দুদকের ওই পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করা বা মিথ্যা তথ্য প্রদান করলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভিন্ন ধাপে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১৯১ জনকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও ২২ জনের কাছে নোটিশ জারির কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

এ পর্যন্ত নোটিশপ্রাপ্ত ১৬৭ জন কমিশনের কাছে তাদের সম্পদ বিবরণী জমা দিয়েছেন। এসব বিবরণী যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দুদক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারি করা হয়েছে। আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে নোটিশ জারির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, যারা ইতোমধ্যে সম্পদ বিবরণী জমা দিয়েছেন, তাদের মধ্যে ২৫ জনের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদের দাখিল করা সম্পদ বিবরণীও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অধিকতর তদন্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। আর যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী জমা দেবেন না, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আকতারুল ইসলাম আরও বলেন, দাখিল করা সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে বাস্তব সম্পদের অসামঞ্জস্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা করা হবে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী কমিশন আদালতের কাছে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক কিংবা অবরুদ্ধ করার আবেদনও করতে পারে।

জালিয়াতির অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী-এমপিরাও অভিযুক্ত

মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং সেই অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর এবং বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের বিরুদ্ধে পৃথক ১২টি মামলা করেছে দুদক।

অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল), সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী, সাবেক সংসদ সদস্য ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমদ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুস সোবহান ভূঁইয়াসহ বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা পরস্পরের যোগসাজশে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) নিবন্ধনের শর্ত লঙ্ঘন করে সরকার নির্ধারিত কর্মীপ্রতি ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার পরিবর্তে পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিমান টিকিট ও অন্যান্য খাতে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে তা আত্মসাৎ করেছেন।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সাব-এজেন্ট, বিমানের টিকিট এবং অন্যান্য মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থ সরকার নির্ধারিত ফি’র আওতার বাইরে নেওয়া হতো। পরবর্তীতে ওই অর্থ বিভিন্ন উপায়ে বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও মামলার অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ