রবিবার, জুলাই ৫, ২০২৬

জামায়াত এমপি শাহজাহান চৌধুরীর পিএসকে ঘিরে একের পর এক অ’ভিযোগ, অস্বস্তিতে দল

অনিয়ম, দুর্নীতি, চাঁদাবাজির অভিযোগ, ব্যবসায়ীকে তুলে এনে মারধরের পর অর্থ আদায়, খাল খননের নামে ডিও (ডেমি-অফিশিয়াল) লেটার ইস্যু এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ—এমন একাধিক বিতর্কে নাম জড়িয়েছে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. আরমান উদ্দিনের। এসব ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দলীয় নেতাদের মধ্যেও অস্বস্তি ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় আরমান উদ্দিন ‘আরমান এমপি’ নামে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, আর্থিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে তার প্রভাবের কারণে অনেকেই সরাসরি সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর লোহাগাড়ার ব্যবসায়ী খোরশেদ আলমকে তুলে এনে নির্যাতনের পর অর্থ আদায়ের অভিযোগের মধ্য দিয়ে আরমান উদ্দিনকে ঘিরে বিতর্কের শুরু। এরপর সম্প্রতি টংকাবতী খাল খননের নামে বালু উত্তোলনের অনুমতি পেতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহাদাত হোসেনের পক্ষে ডিও লেটার সংগ্রহে ভূমিকা রাখার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

সরকারি নথি অনুযায়ী, শাহাদাত হোসেন নিজস্ব অর্থায়নে টংকাবতী খাল খননের অনুমতি চেয়ে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর কাছে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ মে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে অনুমতির অনুরোধ জানিয়ে একটি ডিও লেটার দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে পাঠানো হয় এবং বর্তমানে আবেদনটি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে তদন্তাধীন রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাহাদাত হোসেনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবু রেজা মো. নেজাম উদ্দিন নদভীসহ দলটির বিভিন্ন নেতার সঙ্গে তোলা ছবি রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শাহাদাত হোসেন ও আরমান উদ্দিন ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে একসঙ্গে কাজ শুরু করেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। তিনি বলেন, “আমার নাম ব্যবহার করে কোনো ইজারার অনুমোদন দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। বর্ষায় এলাকার সড়কের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। মানুষকে ইট বিছিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। আমি নিজেই সরকারি ইজারা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছি। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

যদিও স্থানীয়দের অভিযোগ, আরমান উদ্দিনের সহযোগিতায় টংকাবতী খালের বিভিন্ন স্থান থেকে বালু উত্তোলন করে স্তূপ করা হয়েছে। তাদের দাবি, খাল খননের আড়ালে শাহাদাত হোসেন ও আরমান উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি চক্র বালু ব্যবসা পরিচালনা করছে।

এ বিষয়ে শাহাদাত হোসেন বলেন, “বালু না তোলার কারণেই রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। এখন বালু উত্তোলন না করলে পুরো এলাকা আবার প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

‘আরমান এমপি’ পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

গত ১৯ জুনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই অডিওতে লোহাগাড়ার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন নিয়ে কথোপকথন শোনা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে। কথোপকথনটি আরমান উদ্দিন ও যুবদল-সংশ্লিষ্ট মো. তারেকুল হকের মধ্যে হয়েছে বলে অভিযোগ।

ফাঁস হওয়া অডিওতে তারেকুল হককে বলতে শোনা যায়, “লোহাগাড়ায় এমপি কেন আসবে? আসলে পায়ে গুলি করে জিজ্ঞেস করব কেন এসেছে। এখানে আরমান সাহেবের কথাই চলবে। লোহাগাড়ার এমপি আরমান।” জবাবে আরমান উদ্দিনকেও কথা বলতে শোনা যায়।

অডিওটি প্রকাশের পর গত ২২ জুন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতে ইসলামী এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। জেলা জামায়াতের মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক আবু নাছের বলেন, “শাহজাহান চৌধুরীকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ঘটনার বিষয়ে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।” তবে বিবৃতিতে আরমান উদ্দিনের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

আকাশ চৌধুরীর সঙ্গেও নাম জড়ায়

গত ২৮ মে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক নারীকে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে লাথি মারার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াত কর্মী আকাশ চৌধুরীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

পরবর্তীতে সাতকানিয়া পৌরসভার জামায়াত-সমর্থক আবদুল মোমেন ও আকাশ চৌধুরীর একটি অডিও প্রকাশ্যে আসে। ওই অডিওতে ইটভাটার মাটির ব্যবসা নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে আকাশ দাবি করেন, ওই ব্যবসায় পিএস আরমান উদ্দিনও সম্পৃক্ত রয়েছেন।

এসব অভিযোগের পর দলীয়ভাবে তদন্ত শুরু হয়। পরে গত ১৩ জুন শাহজাহান চৌধুরীকে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমিরের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

বক্তব্য মেলেনি আরমান উদ্দিনের

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত ২৭ জুন থেকে পাঁচ দিন ধরে মো. আরমান উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাকে মোবাইলে ১৯ বার কল, হোয়াটসঅ্যাপে ১৫ বার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। একবার ফোন রিসিভ করলেও কোনো বক্তব্য দেননি। পরে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াত কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দলীয় সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শাহজাহান চৌধুরী ও তার ব্যক্তিগত সহকারীকে ঘিরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দলের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জামায়াতের নেতাদের সাধারণত ব্যক্তিগত সহকারী রাখার প্রচলন নেই। তবে শাহজাহান চৌধুরী ব্যতিক্রম হিসেবে সবসময় আরমান উদ্দিনকে সঙ্গে রাখেন। এমনকি দলীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেও তার উপস্থিতি অনেক নেতাকে বিব্রত করে।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “বিষয়টি নিয়ে দক্ষিণ জেলা জামায়াত ইতোমধ্যে লিখিত প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। এরপরও আমরা সব বিষয়ে সতর্ক রয়েছি।”

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ