
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প ‘কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ’ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং তদারকিতে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ২ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের কাজ এখনো সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। এরই মধ্যে নির্মাণাধীন বিভিন্ন অংশে ফাটল ও ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা দেওয়ায় প্রকল্পের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টরা। তারা পুরো প্রকল্পের নির্মাণমান, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের পানি ও বন্যা থেকে চট্টগ্রাম নগরীকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। তবে বাস্তবায়নের শুরু থেকেই নানা অনিয়ম, নির্মাণকাজের ধীরগতি, ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি এবং কাজের মান নিয়ে অভিযোগ সামনে আসতে থাকে।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ-কাম-সড়কের কাজ এখনো শতভাগ সম্পন্ন হয়নি। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার আগেই খালের মুখে নির্মিত রেগুলেটরের বিমে ফাটল দেখা দিয়েছে। এছাড়া পানি প্রতিরোধে স্থাপিত কয়েকটি কংক্রিট ব্লকেও ক্ষয় ও ভাঙনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে মানসম্মত উপকরণের পরিবর্তে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের দাবি, ভরাট কাজে পুরোনো ভবনের ভাঙা ইট, নির্মাণ বর্জ্য (রাবিশ), পলেস্তরা ও নিম্নমানের মাটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাঁধ ও সড়কের স্থায়িত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
প্রকল্পটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয় এবং ২০২০ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় একাধিক দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রথমে ২০২৪ সালের জুন, পরে ২০২৫ সালের জুন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হলেও কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে।
একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ৪৬৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রকল্পের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকি যথাযথ হলে কেন বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বাড়াতে হলো? যদিও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জমি অধিগ্রহণ এবং বাস্তবায়নজনিত বিভিন্ন জটিলতাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, সমালোচকদের মতে এর পেছনে পরিকল্পনার দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটির সার্বিক তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী রাজিব দাশ নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। অভিযোগকারীদের দাবি, কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার পরিবর্তে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে নিম্নমানের কাজকে প্রশ্রয় দিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী রাজিব দাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি প্রতিবেদককে বলেন, “আপনি নিউজ করেন, এই পর্যন্ত নিউজ করে কেউ আমার কিছু করতে পারেনি। তাই আপনার ইচ্ছা হলে আপনার মতো নিউজ করেন। এতে আমার কোনো ক্ষতি নেই।” অভিযোগ রয়েছে, বক্তব্য দেওয়ার পর তিনি প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্লক করে দেন।
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের মতো উপকূলীয় ও জোয়ারপ্রবণ অঞ্চলে শহর রক্ষা বাঁধ ও নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের নির্মাণমানের সঙ্গে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। কারণ এ ধরনের প্রকল্পের দুর্বলতা শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নয়, ভবিষ্যতে নগরবাসীর নিরাপত্তা ও জনজীবনের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাদের মতে, হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে নির্মাণমান, ব্যয় বৃদ্ধি, সময়ক্ষেপণ এবং নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রকল্পের গুণগত মান পুনর্মূল্যায়নেরও দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল।

