শনিবার, জুলাই ৪, ২০২৬

সিরাজগঞ্জ গণপূর্তে টেন্ডার অ’নিয়মের অ’ভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানকে ঘিরে বিতর্ক

সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, জালিয়াতি এবং নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোটি কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান। স্থানীয় ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকারি ক্রয়বিধি উপেক্ষা করে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী ঠিকাদার এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে একটি ডিপ টিউবওয়েল স্থাপনের জন্য আহ্বান করা টেন্ডার (আইডি: ১১৭৩৮৫০)-এ সংশ্লিষ্ট কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও টাঙ্গাইলের ‘বীথি কনস্ট্রাকশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভাইয়ের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানকে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের কাজের অভিজ্ঞতা ও দরপত্র মূল্যায়নের নথিপত্র চেয়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হলেও নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য সরবরাহ করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। তথ্য না পাওয়ায় আবেদনকারী পক্ষ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

আরএফকিউ প্রক্রিয়ায় সোয়া কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চলতি অর্থবছরে বড় প্রকল্পগুলোকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার ৩৭টি রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন (RFQ) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনায় (APP)। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি আরএফকিউর মাধ্যমে দ্রুত কাজ সম্পন্ন ও বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

একই প্রতিষ্ঠানের হাতে একের পর এক কাজ

অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়াভিত্তিক ‘এসএ এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে। অভিযোগ রয়েছে, গত দুই অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটিকে একের পর এক লাভজনক কাজ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি যেসব কাজ পেয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—

  • টেন্ডার আইডি: ১১৫১১৪৩ — শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবস্টেশন ভবন নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ (চুক্তিমূল্য: ৬৪ লাখ ৭২৪ টাকা)।
  • টেন্ডার আইডি: ১২১৩২৬১ — জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এ-ব্লকের টাইলস ও রেলিং মেরামত (চুক্তিমূল্য: ১১ লাখ ৬১ হাজার ৮১০ টাকা)।
  • টেন্ডার আইডি: ১২১৩২৭২ — একই কার্যালয়ের বি-ব্লকের সিঁড়িতে টাইলস স্থাপন ও ছাদ সংস্কার (চুক্তিমূল্য: ৯ লাখ ৮৪ হাজার ১৮০ টাকা)।
  • টেন্ডার আইডি: ১২১৩২৪৭ — সি-ব্লকের সংস্কার কাজ (বরাদ্দ: ১৯ লাখ ৬১ হাজার ৫২০ টাকা)।
  • টেন্ডার আইডি: ১১৭৩৭৮৮ — জেলা কারাগারের আবাসিক ভবন মেরামত (চুক্তিমূল্য: ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩২৯ টাকা)।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসএ এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্স ব্যবহার করা হলেও প্রকৃতপক্ষে কাজগুলো নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ তদারকিতে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১-এ স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একই প্রতিষ্ঠানের নামে শতাধিক কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে তার পদোন্নতি দীর্ঘদিন স্থগিত ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। পরে রাজনৈতিক তদবিরে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সিরাজগঞ্জে বদলি হওয়ার পর তিনি নতুন করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরের জুন ক্লোজিংয়ে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিতর্কিত আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে ঢাকার ‘বাবর অ্যাসোসিয়েটস’-কে জেলা আনসার ও ভিডিপি কার্যালয়ের অস্ত্রাগার ভবনের তৃতীয় তলা নির্মাণকাজ (টেন্ডার আইডি: ১১৩৫৭২০) দেওয়া হয়েছে, যার চুক্তিমূল্য ৬৫ লাখ ২০ হাজার ৯৭৮ টাকা

এছাড়া ‘এইচবি ট্রেডার্স লিমিটেড’-কে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদপ্তরের ডিআইজি ভবন প্রকল্পে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন, সাবস্টেশন ও জেনারেটর সরবরাহের কাজ (টেন্ডার আইডি: ১১৩৩৫২৫) দেওয়া হয়েছে ৮৭ লাখ ৯৮ হাজার ১৭৪ টাকায়

অন্যদিকে, জেলা প্রশাসকের রেকর্ডরুম সংস্কারের কাজ (টেন্ডার আইডি: ১২৪৭০০০) পেয়েছে ‘প্যাসিফিক ইঞ্জিনিয়ার্স’, যার চুক্তিমূল্য ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ১৭৬ টাকা। এছাড়া ২ কোটি ৪২ লাখ ২৬ হাজার ৬৩২ টাকা ব্যয়ে রাজগঞ্জ পুলিশ সার্কেল কাম রেসিডেন্স ভবনের অবশিষ্ট নির্মাণকাজ (টেন্ডার আইডি: ১২০৬৭৭৪) দেওয়া হয়েছে ‘মেসার্স পূর্বাঞ্চল ট্রেড’-কে।

স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, এসব কাজের দরপত্র মূল্যায়নে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ছাড়াই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি প্রকল্পের কাজের মান নিয়েও ব্যবহারকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মে নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানকে সহায়তা করছেন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) কল্যাণ কুমার কুণ্ডু এবং এসডিই (ই/এম) মিজানুর রহমান আকন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ