শনিবার, জুলাই ৪, ২০২৬

ওজনস্কেল কা’র’চু’পি ও শুল্ক ফাঁ’কি’র অ’ভিযোগে বেনাপোল বন্দর, রাজস্বে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার ঘাটতি

দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে ডিজিটাল ওজনস্কেলে কারচুপি, মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাস এবং পণ্য আত্মসাতের একের পর এক ঘটনায় সরকারের রাজস্ব আহরণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এদিকে, ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আশিকুর রহমান রনি এবং সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম-১কে ঘিরে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছেন বন্দরসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র। অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা, ফলে অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। একই সময়ে বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ২ হাজার ১৪৪ মেট্রিক টন পণ্য। আগের অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭ হাজার ২৯ দশমিক ৩৮ কোটি টাকা এবং আমদানি হয়েছিল ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০৯ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরে রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা এবং আমদানি কমেছে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৫ মেট্রিক টন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, উচ্চমূল্যের ফল, শাড়ি ও থ্রি-পিসের আমদানিও কমেছে।

তবে ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পণ্যের ওজন পরিবর্তন, মিথ্যা ঘোষণা এবং সাফটা (SAFTA) সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ সৃষ্টি করছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, রাজস্ব ঘাটতির পেছনে আমদানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি এবং শুল্কহারের পরিবর্তনের মতো কারণও ভূমিকা রেখেছে। তবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের মতে, শুল্ক ফাঁকি ও ওজন কারচুপিও রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, সাফটা সুবিধার আওতায় আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কহার গত তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে শুল্কহার ছিল ৭ শতাংশ, তা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ১১ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়। শুল্কহার বৃদ্ধির পর থেকেই কিছু অসাধু চক্র কম শুল্কে পণ্য ছাড় করাতে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, ভারত থেকে আমদানির ক্ষেত্রে সাফটা সুবিধা মিললেও বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা ভারতে একই ধরনের সুবিধা কার্যত পান না।

একাধিক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের অভিযোগ, বন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নিম্ন শুল্কের পণ্যের ঘোষণার আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য ছাড়ের সুযোগ করে দেন। অতীতেও কাস্টমস ও বিজিবি এ ধরনের একাধিক চালান জব্দ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ওজন পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘোষণাপত্র ও প্রকৃত পণ্যের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে কম শুল্ক পরিশোধের সুযোগ নেওয়া হয়।

সম্প্রতি বেনাপোল কাস্টমস হাউসের একটি দাপ্তরিক চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। সহকারী কমিশনার অব কাস্টমস অটল গোস্বামী স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত ১৪ জুন বন্দরের ৫ নম্বর ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে একই ভারতীয় খালি ট্রাক (নম্বর: HR-38-AK-4018) একই সময়ে দুটি পৃথক পণ্যতালিকায় দুই ধরনের ওজন দেখানো হয়েছে। একটিতে ট্রাকটির খালি ওজন ৪ হাজার ৮৮০ কেজি, অন্যটিতে ৪ হাজার ৯২০ কেজি উল্লেখ করা হয়। একই ট্রাকের ক্ষেত্রে একই সময়ে ভিন্ন ওজন প্রদর্শনের ঘটনায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ট্রাফিক পরিচালকের কাছে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমসের এক কর্মকর্তা জানান, ওজনের অসঙ্গতি ধরা পড়া চালানটি ছিল সাইকেলের যন্ত্রাংশের। পরে ২৫ জুন কাস্টমস চালানটি আটক করে এবং তদন্ত শুরু করে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বন্দরের ৩১ নম্বর পচনশীল পণ্যের শেড ঘিরেও বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া পণ্য একই শেডের বিভিন্ন স্থানে ভাগ করে রাখা হয় এবং পরে সুবিধাজনক সময়ে ধাপে ধাপে খালাস করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় একই ধরনের অনিয়ম বারবার ঘটছে।

এর আগে ১২ মার্চ বেনাপোল স্থলবন্দরের ৩৭ নম্বর শেড থেকে ‘সাফা ইমপেক্স’-এর বেকিং পাউডার ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস ও অন্যান্য উচ্চ শুল্কের পণ্য আত্মসাতের ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ১০ জুন এ ঘটনায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে বেনাপোল পোর্ট থানায় মামলা করে কাস্টমস। এর মাত্র পাঁচ দিন পর ২৬ নম্বর শেডে ‘টি এস ইন্টারন্যাশনাল’-এর ইরেজার ও পেনসিল ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ৩ হাজার ৩৮৫ পিস উচ্চ শুল্কের পণ্য জব্দ করা হয়।

এছাড়া ২৫ এপ্রিল রোকেয়া ট্রেডার্সের আমদানি করা আঙুরবোঝাই একটি ভারতীয় ট্রাকের ক্ষেত্রেও ওজনের গরমিল ধরা পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রাকটির প্রকৃত খালি ওজন ছিল ১৩ হাজার ৩১০ কেজি, কিন্তু ওজন স্লিপে তা ১৩ হাজার ৮৮০ কেজি দেখানো হয়। সে সময় দায়িত্বে থাকা ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আশিকুর রহমান রনি দাবি করেন, তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং যন্ত্রের কারিগরি ত্রুটির কারণেও এমন পার্থক্য হতে পারে।

জুন মাসে শুল্ক ফাঁকি ও পণ্য পাচারের অভিযোগে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ চারটি পৃথক মামলা দায়ের করেছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামাসহ মোট ৫৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, আরিফুল ইসলাম চৌধুরী, কাস্টমস সিপাই মোহাম্মদ সাগর এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রয়েছেন। এছাড়া ২৭ জুন কেমিক্যাল জোন থেকে ভারতীয় ট্রাকের পণ্য অবৈধভাবে বাংলাদেশি ট্রাকে স্থানান্তরের ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক মামলা করে।

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, “যে ঘটনায় মামলা হয়েছে, সেখানে শেড ইনচার্জকে কেন বাদ দেওয়া হলো, সেটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শেডের ভেতরে কীভাবে পণ্য বের হলো, তার দায়ও তদন্তে খতিয়ে দেখা উচিত।”

ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি বলেন, “বেনাপোল দেশের অন্যতম প্রধান রাজস্ব আহরণকারী বন্দর। এখানে ওজন নির্ধারণে সামান্য অনিয়মও সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্বে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পুরো ওজন ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আনতে হবে।”

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, অভিযোগের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বন্দরের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, ওজনযন্ত্রে কারচুপি বা অন্য যেকোনো অনিয়মের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কাস্টমসের চিঠি পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাস্টমস কমিশনার মো. ফাইজুর রহমান বলেন, সরকারের এক টাকার রাজস্বও যাতে ফাঁকি না যায়, সে বিষয়ে কাস্টমস সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। ওজনস্কেলে কারচুপি, মিথ্যা ঘোষণা বা শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, তার বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি জানান, ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। তদন্তে কাস্টমস কর্মকর্তা, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, আমদানিকারক বা অন্য কারও সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলাও করা হবে। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব সুরক্ষা ও স্বচ্ছ বাণিজ্য নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং আরও জোরদার করা হচ্ছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ