বৃহস্পতিবার, জুন ১৮, ২০২৬

২০ বছর ধরে ভাড়া আদায়, রসিদ নেই! ত্রিশালের মহিলা বিপণিকেন্দ্রে অ’নিয়মের অ’ভিযোগ

ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌরসভার মহিলা বিপণিকেন্দ্রের দোকান বরাদ্দ ও ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং রাজস্ব বঞ্চনার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দোকানপ্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা ভাড়া আদায় করা হলেও পৌরসভার হিসাব খাতায় জমা দেখানো হয়েছে মাত্র ৩০০ টাকা। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে চলা এ অনিয়মে পৌরসভা লাখ লাখ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে প্রতিষ্ঠিত মহিলা বিপণিকেন্দ্রটিতে শুরুতে ছয়টি দোকান ছিল। পরবর্তীতে আরও দুটি দোকান যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে মোট আটটি দোকান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব দোকানে চা-স্টল, কাঁচামাল, ওষুধের দোকানসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৫ আগস্টের আগে দোকানগুলোর ভাড়া আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। পরে পৌরসভার বাজার পরিদর্শক রাজিবুল ইসলাম এবং পরবর্তীতে প্রধান সহকারী এছহাক আলী দোকানপ্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাড়া আদায় করেন। তবে পৌরসভার কোষাগারে জমা দেখানো হয়েছে মাত্র ৩০০ টাকা করে। ফলে বাকি অর্থ কোথায় গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের উচ্ছেদ করে নতুন করে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, গত বছরের ৩ জুলাই এবং চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি ব্যবসায়ীদের দোকান ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ১৮ জানুয়ারি পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী সেনাবাহিনীর সহায়তায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে গেলে স্থানীয়দের বাধার মুখে তা স্থগিত করা হয়।

সে সময় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, বছরের পর বছর তাদের কাছ থেকে কোনো রসিদ ছাড়াই মাসিক ভাড়া আদায় করা হয়েছে। তাদের দাবি, সামান্য পুঁজি বিনিয়োগ করে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে পরিবার চালিয়ে এলেও হঠাৎ উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত তাদের জীবিকাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

পরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনার পর নিয়মের মধ্যে অগ্রাধিকার দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দোকানগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ব্যবসায়ীরা দোকানের সামনেই অস্থায়ীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দোকান বরাদ্দের জন্য তিনবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ার অজুহাতে পরে পছন্দের ব্যক্তিদের কম টাকায় দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, আটটি দোকানের মধ্যে দুটি দোকান দরপত্রের মাধ্যমে দোকানপ্রতি ছয় লাখ টাকা অফেরতযোগ্য জামানত এবং মাসিক ১০ হাজার টাকা ভাড়ার শর্তে বরাদ্দ দেওয়া হয়। অন্য দোকানগুলোর ক্ষেত্রেও তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, পাঁচটি দোকানের জন্য এক লাখ টাকা এবং একটি দোকানের জন্য দেড় লাখ টাকা অফেরতযোগ্য জামানত নেওয়া হয়েছে।

নতুন বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় দোকান না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা ও সাবেক যুবদল নেতা হুমায়ুন কবির। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে সম্পৃক্ত থাকার পরও তিনি ন্যায্য সুযোগ পাননি।

দোকানবঞ্চিত ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা, ছফির উদ্দিন ও ওয়াদুদ বলেন, “আমরা ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে ব্যবসা করছি। নিয়মিত ভাড়া দিলেও কখনো কোনো রসিদ পাইনি। যদি জানতাম নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া হবে, তাহলে আমরাও আবেদন করতাম।”

পৌরসভার বাজার পরিদর্শক রাজিবুল ইসলাম বলেন, “৫ আগস্টের পর ছয় মাসের ভাড়া দোকানপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করে জমা দিয়েছি। পৌরসভা কত টাকা পাওয়ার কথা ছিল বা বাকি টাকা কোথায় গেছে, তা আমার জানা নেই।”

প্রধান সহকারী এছহাক আলী বলেন, “আমি ভাড়া আদায় করেছি, তবে এখনো জমা দিইনি। দ্রুত জমা দেওয়া হবে। আমার দায়িত্ব নেওয়ার আগে দোকানপ্রতি মাত্র ৩০০ টাকা জমা হতো।”

সদ্য বিদায়ী পৌর প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার দেবনাথ বলেন, “দোকানপ্রতি ৩০০ টাকা জমা হতো। বাকি টাকা কে নিত, সেটা সবাই জানে। বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পর্কেও আমি পুরোপুরি অজ্ঞ ছিলাম না।”

বর্তমান পৌর প্রকৌশলী লুৎফুল ইসলাম বলেন, আটটি দোকানের মধ্যে দুটি আগে থেকেই দরপত্রের মাধ্যমে বরাদ্দ ছিল। বাকি ছয়টি দোকানের জন্য তিনবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও সাড়া না পাওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে সক্ষমতার ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।

পৌর প্রশাসক ও ইউএনও আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অনেক চেষ্টা করে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। নিয়ম মেনে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কেউ অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে থাকলে তা কার কাছে দিয়েছে, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।”

এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে। তাদের মতে, দোকান ভাড়া আদায়, বরাদ্দ প্রক্রিয়া এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার পুরো বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা হলে পৌরসভার আর্থিক ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এবং অনিয়মের দায় কার ওপর বর্তায়, তা স্পষ্ট হবে।

স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি রাজস্ব ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ