
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনে কিছু পরিবর্তন এলেও এখনো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে বহাল রয়েছেন সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাভোগী হিসেবে অভিযুক্ত কিছু কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে অন্যতম বর্তমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সচিব মো. শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। তার বিরুদ্ধে অতীতে পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক-এর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী তৎকালীন বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির তালিকায় ব্যাপক কাটছাঁট করেন। বিশেষ করে বিএনপি-ঘরানার বা ছাত্রজীবনে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন—এমন কর্মকর্তাদের বাদ দিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সে সময় শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে, সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সুপারিশকৃত নথিতেও হস্তক্ষেপ করেন। এমনকি তৎকালীন জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনাকেও তিনি গুরুত্ব দিতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর ১৩৩ জন যুগ্মসচিবকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর আগে এসএসবি দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে ১৭২ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করেছিল। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বিবেচনার জন্য আরও ১৯ জন কর্মকর্তার আলাদা তালিকাও প্রস্তুত করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সুপারিশসংবলিত ফাইল ২০১৭ সালের ২ নভেম্বর প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হলেও তা নিয়ম অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়নি। বরং শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী ফাইলটি প্রায় এক মাসের বেশি সময় নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যাপক কাটছাঁট করেন। অভিযোগ রয়েছে, এসএসবির সুপারিশপ্রাপ্ত প্রায় ৮০ জন কর্মকর্তার নাম বাদ দিয়ে নিজের পছন্দের কিছু কর্মকর্তার নাম যুক্ত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যেসব কর্মকর্তা বিএনপি-জামায়াত ঘরানার হিসেবে পরিচিত ছিলেন বা অতিমাত্রায় নিরপেক্ষ ও সৎ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাদের বাদ দিতেই এই ‘কচুকাট’ নীতি অনুসরণ করা হয়। পরে সংশোধিত তালিকা এসএসবির জরুরি বৈঠকে অনুমোদন করিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয় এবং একদিনের মধ্যেই পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ফাইলটি আগে পাঠানো হয়েছিল এবং সেখান থেকে পর্যবেক্ষণসহ ফেরত এসেছে—এমন তথ্য গণমাধ্যমে প্রচার করা হলেও বাস্তবে তা সত্য ছিল না। বরং ফাইলটি মন্ত্রণালয়েই আটকে রেখে নিজের ইচ্ছামতো পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
জানা গেছে, ওই পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় শুধু প্রশাসন ক্যাডারেরই ২৫৫ জন যোগ্য কর্মকর্তা বঞ্চিত হন। অন্যান্য ক্যাডার মিলিয়ে এ সংখ্যা ৩০০-এর বেশি বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় সে সময় প্রশাসনে ব্যাপক অসন্তোষ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল বলেও জানা যায়।
প্রশাসনের ১১তম ব্যাচের কর্মকর্তা শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় তিনি ওই ঘরানার সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিমন্ত্রীর পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজের অনুগত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করেন এবং বিএনপিপন্থি হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের প্রশাসনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী প্রশাসনে বিভিন্ন পর্যায়ে শুদ্ধি অভিযান চালানো হলেও শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এখনো ইআরডির সচিব পদে বহাল রয়েছেন। সম্প্রতি তাকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্তির একটি প্রজ্ঞাপন জারি হলেও একদিন পর সেটি স্থগিত করা হয় এবং তিনি পুনরায় স্বপদে বহাল থাকেন।
এ ঘটনায় প্রশাসনের একাংশে ক্ষোভ ও বিস্ময় বিরাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

